বর্ষার পানি এখনো পুরোপুরি নামেনি। বিস্তীর্ণ জলরাশির বুক চিরে ছুটে চলছে নৌকা। চারদিকে পানি, দূরে ভেসে থাকা গ্রাম, খোলা আকাশ আর হাওরের নির্মল প্রকৃতি—সব মিলিয়ে পর্যটকদের টানছে কিশোরগঞ্জের হাওর। তবে এই সৌন্দর্যের পাশাপাশি হাওর ভ্রমণে নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। কয়েকটি ডাকাতির ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি পর্যটকদের সুবিধায় নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।
জেলার প্রধান কয়েকটি প্রবেশপথে স্থাপন করা হয়েছে পর্যটক ছাউনি। সেখানে বিশ্রামের পাশাপাশি নৌকা, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও রিসোর্টের তথ্য, জরুরি ফোন নম্বর, পুলিশের কন্ট্রোল রুম এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। জেলা পুলিশের উদ্যোগে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের পরিকল্পনায় হাওরকেন্দ্রিক পর্যটনকে আরও সহজ ও নিরাপদ করার এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে হাওরে কয়েকটি ডাকাতির ঘটনার পর নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। ট্রলার মালিকদের বিকেল ৫টার পর নৌকা না চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি অভিযান চালিয়ে কয়েকজন ডাকাত সর্দারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে রাত ৮টা পর্যন্ত হাওরে নৌকা চলাচল করছে।
বর্ষার পানি এখনো পুরোপুরি না কমায় নিকলীর বেড়িবাঁধ, করিমগঞ্জের বালিখোলা ও চামড়া নৌবন্দর হয়ে প্রতিদিনই হাওরে ঢুকছেন পর্যটকেরা। পরিবার, বন্ধু কিংবা বিভিন্ন দল নিয়ে তাঁরা নৌকায় ঘুরছেন ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায়।
কিশোরগঞ্জের হাওরে যাওয়ার প্রধান প্রবেশপথগুলোর মধ্যে রয়েছে নিকলীর বেড়িবাঁধ, করিমগঞ্জের বালিখোলা ও চামড়া নৌবন্দর। এসব জায়গা থেকেই নৌকা নিয়ে হাওরে প্রবেশ করেন পর্যটকেরা।
নিকলীর বেড়িবাঁধের মাঝামাঝি স্থানে জেলা পুলিশের উদ্যোগে একটি পর্যটক ছাউনি করা হয়েছে। সেখানে রয়েছে বিশ্রামের ব্যবস্থা। পাশেই রয়েছে পুলিশের কন্ট্রোল রুম। বালিখোলা ফেরিঘাট ও চামড়া নৌবন্দরেও একই ধরনের ছাউনি স্থাপন করা হয়েছে।
প্রতিটি ছাউনির প্রবেশপথে ছোট তোরণে লেখা রয়েছে—‘মাদক ছাড়ি, ভ্রমণ করি’। ছাউনিতে রাখা হয়েছে হাওরের মানচিত্র। কোন জায়গা থেকে কোন এলাকায় কীভাবে যাওয়া যায়, তা দেখানো হয়েছে সেখানে। রয়েছে ট্রলার মাঝিদের ফোন নম্বর ও নৌকা ভাড়ার তালিকাও।
এ ছাড়া হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর ফোন নম্বর রাখা হয়েছে। কোথায় রাত কাটাতে কত খরচ হতে পারে এবং রেস্তোরাঁয় খাবারের স্বাভাবিক মূল্য কত—এসব তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
নিকলী কিংবা বালিখোলা থেকে নৌকা নিয়ে হাওরে ঢুকে পর্যটকেরা যাচ্ছেন ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামে। এসব এলাকা এখন হাওর ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।
বিশেষ করে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অল ওয়েদার সড়ক বর্ষায় পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে। পানির বিস্তীর্ণ প্রান্তরের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া সড়কের দুই পাশে পানি, দূরে গ্রাম আর মাথার ওপর খোলা আকাশ—এই দৃশ্য দেখতে অনেকে নৌকা ভ্রমণের পাশাপাশি সড়কপথেও ঘুরছেন।
মিঠামইনের দিল্লির আখড়া, অষ্টগ্রামের কুতুব শাহী মসজিদসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানেও যাচ্ছেন পর্যটকেরা। পাশাপাশি তাঁরা দেখছেন হাওরের গ্রাম, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও বর্ষায় জলমগ্ন প্রকৃতি।
পর্যটক ছাউনিতে নৌকা, আবাসন ও খাবারের তথ্য থাকায় ভ্রমণের আগেই খরচ সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন তাঁরা।
পর্যটকদের নিরাপত্তার পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে পর্যটক ছাউনিতে। সেখানে রয়েছে প্রাথমিক চিকিৎসার কিট। কোনো পর্যটক অসুস্থ হয়ে পড়লে বা দুর্ঘটনার শিকার হলে তাৎক্ষণিক সহযোগিতার ব্যবস্থা রয়েছে।
এ ছাড়া নৌ পুলিশ ও পর্যটন পুলিশের ফোন নম্বরও রাখা হয়েছে। কোনো সমস্যায় পড়লে পর্যটকেরা এসব নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবেন।
চলতি বছরের শুরুতে হাওরে কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। বিষয়টি জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও ওঠে। পরে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
হাওরের পর্যটনকে শুধু বর্ষার কয়েক মাসে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না পুলিশ সুপার। জেলা শহর থেকে হাওরের বিভিন্ন উপজেলার হোটেল ও রিসোর্টে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন একটি করে কক্ষ বরাদ্দ রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীরা কিশোরগঞ্জে এসে হাওর ভ্রমণ করতে পারেন—এ সুযোগ তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য।
এ ছাড়া স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটন গাইড হিসেবে তৈরি করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে পর্যটকেরা স্থানীয় গাইডের কাছ থেকে হাওরের ইতিহাস, প্রকৃতি, জীবনযাত্রা ও দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে জানতে পারবেন।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান লেখালেখির সঙ্গেও যুক্ত। ‘রহমান শেলী’ নামে তিনি লেখেন। কবিতা ও সাহিত্যের পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতিও তাঁর আগ্রহ রয়েছে।
হাওরের পর্যটন নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা শুধু বর্ষাকালকে ঘিরে নয়। শুকনো মৌসুমেও পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে দিগন্তজোড়া হাওরের বিভিন্ন স্থানে জেলা পুলিশের উদ্যোগে অস্থায়ী তাবু স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটন গাইড তৈরির উদ্যোগও এর অংশ। বর্ষায় নৌকায় হাওর দেখা আর শুকনো মৌসুমে হাওরের বিস্তীর্ণ প্রান্তর ঘুরে দেখার সুযোগ তৈরি করতে চায় জেলা পুলিশ।
জেলা পুলিশের দাবি, এসব উদ্যোগের ফলে চলতি বছর কিশোরগঞ্জের হাওরে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পর্যটকের সমাগম হয়েছে।
হাওরে নৌকায় ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সময় বর্ষা। সাধারণত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ থেকে পানি বাড়তে শুরু করে এবং আশ্বিন-কার্তিক পর্যন্ত হাওর পানিতে পূর্ণ থাকে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করে।
সেপ্টেম্বরের শেষ সময়ে এসে হাওরে নৌকায় ঘোরার সুযোগ তাই আর বেশি দিন থাকবে না। পানি কমে গেলে বিস্তীর্ণ জলরাশির মধ্যে নৌকায় ঘোরার সুযোগও কমে আসবে।
তবে বর্ষা শেষ হওয়ার পরও হাওরের পর্যটন চালু রাখতে চায় জেলা পুলিশ। এ জন্য শুকনো মৌসুমে হাওরের ভিন্ন রূপ পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান জানান, বর্ষায় হাওরে পানি আসার শুরুতে কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছিল। তিনি বিষয়টি পুলিশ সুপারকে জানান। পুলিশ সুপার গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ডাকাতদের গ্রেপ্তার করেন। এখন কিশোরগঞ্জের হাওর পর্যটকদের জন্য নিরাপদ।
কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনের সংসদ সদস্য ও সরকারের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম জানান, হাওরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি পর্যটকদের সুবিধার জন্য পুলিশ সুপারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তিনি আরও কাজ করবেন বলে আশা করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো পর্যটক এসে যেন কিশোরগঞ্জকে খারাপ বলে যেতে না পারেন, সে জন্য পুলিশ সুপারের উদ্যোগকে আরও উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
কিশোরগঞ্জ জেলার আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, হাওরের পর্যটন প্রসারে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের পরিকল্পনার কথা জেনে তাঁরও হাওর পর্যটনের প্রতি আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে কিশোরগঞ্জের হাওর একসময় শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের অন্যতম পর্যটন এলাকায় পরিণত হতে পারে।