হোম > সারা দেশ > খুলনা

আজমুল হত্যা: নির্যাতন করে ভাত চুরির স্বীকারোক্তির ভিডিও ধারণ করা হয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা 

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার শেখ আসিফ হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

খুলনায় নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আয়মান মো. আজমুল হোসেনকে নির্যাতনের পর চুরি করে ভাত খাওয়া এবং মোবাইল ফোন ও টাকা চুরির অভিযোগ স্বীকারে বাধ্য করা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন এ মামলায় নতুন গ্রেপ্তার শেখ আসিফ হোসেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে কয়েকজন জোর করে আদায় করা স্বীকারোক্তির ভিডিও ধারণ করেন। একপর্যায়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ভয় দেখানো হলে আজমুল চারতলার ছাদ থেকে তৃতীয় তলায় লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পরে পা পিছলে নিচে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

আজ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) গ্রেপ্তার হওয়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শেখ আসিফ হোসেন (২৮) এলিট ফোর্স এসআরবি-৬-এর জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলায় গত দুই দিনে মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী তিনজন এবং একজন জুস বিক্রেতা।

মামলার তদন্তে দিন যত যাচ্ছে, ততই নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া এক আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

এসআরবি-৬-এর অধিনায়ক নিন্তার আহমেদ জানান, আজমুল হত্যা মামলায় শেখ আসিফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসআরবি-৬, স্পেশাল কোম্পানি ও ভাটিয়াপাড়া ক্যাম্পের যৌথ অভিযানে বুধবার রাত আড়াইটার দিকে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী থানাধীন ভাটিয়াপাড়া গোলচত্বর এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। আসিফ খুলনার পাইকগাছা উপজেলার সনাতনকাটি গ্রামের শেখ মিরাজের ছেলে। তিনি জানান, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আসিফকে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) হরিণটানা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

এসআরবি সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে আসিফ আজমুলের মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। আসিফের ভাষ্য, একটি বেসরকারি ব্যাংকে তাঁর চাকরি হয়েছিল এবং ২০ সেপ্টেম্বর তাঁর যোগদানের কথা ছিল। কিন্তু ১৮ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে আজমুলের মৃত্যুর পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান।

ঘটনার বিষয়ে আসিফ দাবি করেন, গত শুক্রবার রাতে তিনি তাঁর ব্যাচের সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা করতে ওই ভবনে যান। আজমুলকে মারধরের সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। একপর্যায়ে আজমুলকে চারতলার ছাদে নিয়ে মারধর করা হয় এবং তাঁকে দিয়ে চুরি করে ভাত খাওয়া, মোবাইল ফোন ও টাকা চুরির কথা স্বীকার করানোর চেষ্টা করা হয়।

আসিফের দাবি, এ সময় উপস্থিত কয়েকজন আজমুলের বক্তব্যের ভিডিও ধারণ করেন। পরে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হলে ভয়ে আজমুল চারতলার ছাদ থেকে তৃতীয় তলায় লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। সেখানে পা পিছলে নিচে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

তবে আসিফের এসব বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদে আসিফ ম্যাচ ম্যানেজার মেহেদী এবং কৃষি ব্যাংকের খুলনার টাউন নওয়াপাড়া শাখার ক্যাশ অফিসার হাবিব রিফাতের এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার কথা জানিয়েছেন বলে দাবি করেছে এসআরবি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে আজমুলকে নির্যাতনের ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তবে আজমুলকে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল না বলেও দাবি করেছেন তিনি।

এ ছাড়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা হলের সামনে থাকা ‘মা-বাবার দোয়া তানহা জুস কর্নার’-এর মালিক তারেক ওরফে রুবেল আজমুলকে বেশি মারধর করেছেন বলেও আসিফ দাবি করেছেন।

এর আগে গতকাল মঙ্গলবার এসআরবি হাবিব রিফাত (৩০) ও তারেক ওরফে রুবেলকে (৩৫) গ্রেপ্তার করে। অপর দিকে প্রতাপ সরকার (২৮) নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তাঁদের মধ্যে হাবিব রিফাত আদালতে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল হোসেন জানান, আজমুল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হাবিব রিফাত আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪-এর বিচারক ইব্রাহীম খলিল মাহিমের কাছে তিনি এ জবানবন্দি দেন।

ওসি আরও বলেন, অন্যান্য আসামিও স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিতে পারেন। ম্যাচ ম্যানেজার মেহেদীকে গ্রেপ্তার করা গেলে ঘটনা সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

১৮ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল রোড-সংলগ্ন ইসলামনগর সড়কের একটি চারতলা ভবনের ছাদে ভাত চুরির অভিযোগে আজমুলকে মারধর করা হয়। পরে তিনি ভবন থেকে পড়ে মারা যান। স্বজনদের দাবি, তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

এ ঘটনায় গত শনিবার রাতে নিহত আজমুলের বাবা কুতুবউদ্দিন বাদী হয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীসহ ২০ থেকে ২৫ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করে হরিণটানা থানায় হত্যা মামলা করেন। এ মামলায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।