হোম > সারা দেশ > যশোর

মবের পিটুনিতে থেমে গেল ফয়েজের রিকশার চাকা

মাদকসেবী অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা, ২ কিশোরের স্বীকারোক্তি

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

পিবিআইয়ের হাতে আটক দুই কিশোর। ছবি: পিবিআই

দিনভর রিকশা চালিয়ে রাতে বাড়ি ফিরছিলেন মো. ফয়েজ আহাম্মদ। কিন্তু বাড়ি ফেরা হয়নি তাঁর। মাদকসেবীর অপবাদ দিয়ে একদল লোক তাঁকে ঘিরে ধরে। লাঠি ও রড দিয়ে চলে বেধড়ক পিটুনি। একপর্যায়ে রক্তাক্ত ফয়েজকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে যায় হামলাকারীরা। স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

গত ১১ জুন মধ্যরাতে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর শাকতলা ছিদ্দিকিয়া আলীয়া মাদ্রাসার পূর্ব পাশে এবং পরে নদোনা আছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন সড়কে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, পূর্বশত্রুতার জের ধরে ফয়েজকে মাদকসেবী হিসেবে অপবাদ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে মব তৈরি করা হয়েছিল। সেই মবের হামলাতেই প্রাণ হারান এই রিকশাচালক।

এ ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই সদস্যকে আইনের হেফাজতে নিয়েছে পিবিআই। আজ রোববার তাদের আদালতে হাজির করা হলে দুজনই ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।

পিবিআই নোয়াখালী জেলার পুলিশ সুপার ও মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা আর এম ফয়জুর রহমান জানান, রোববার ভোররাতে শাকতলা গ্রামে অভিযান চালিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দুই কিশোরকে আইনের হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হলে তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়।

পিবিআই সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ জুন রাত ১১টা থেকে রাত ১টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে শাকতলা ছিদ্দিকিয়া আলীয়া মাদ্রাসার পূর্ব পাশে এবং পরে নদোনা আছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন সড়কে ফয়েজের ওপর হামলা চালানো হয়। ১০ থেকে ১২ জন মিলে তাঁকে ঘিরে মব তৈরি করে। এরপর লাঠিসোঁটা ও রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়।

গুরুতর আহত অবস্থায় ফয়েজকে রাস্তার ওপর ফেলে রেখে যায় হামলাকারীরা। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় নিহতের বড় ছেলে রেজাউল করিম বাদশা বাদী হয়ে সোনাইমুড়ী থানায় মামলা করেন। মামলায় সবুজ (২২), মনা (২৫) ও জামালসহ (২৬) ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে মামলাটি পিবিআইয়ের সিডিউলভুক্ত হলে গত ২৫ আগস্ট সংস্থাটির নোয়াখালী জেলা স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে।

তদন্তে পিবিআই জানতে পারে, আটক দুই কিশোর নিজ এলাকা ও আশপাশের এলাকার কিশোরদের নিয়ে একটি কিশোর গ্যাং গড়ে তুলেছিল। এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি, অরাজক পরিস্থিতি তৈরি এবং মব সৃষ্টি করে জনশান্তি বিঘ্নিত করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, পূর্বশত্রুতার জের ধরেই ফয়েজকে মাদকসেবী হিসেবে অপবাদ দেওয়া হয়। এরপর পরিকল্পিতভাবে মব তৈরি করে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। হামলায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যসহ আরও কয়েকজন অংশ নেয়।

পিবিআই নোয়াখালী জেলার পুলিশ সুপার আর এম ফয়জুর রহমান বলেন, গ্রেপ্তার দুই কিশোরের নাম মামলার এজাহারে ছিল না। তবে তদন্তে তাঁদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আরও ৭ থেকে ৮ জনের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদেরও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি এজাহারভুক্ত আসামিদের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।