যশোর সদরের কৃষ্ণবাটি রেল ক্রসিং পার হওয়ার সময় একটি ইজিবাইককে চাপা দেয় ট্রেন। ঘটনাস্থলেই মারা যান ইজিবাইকচালক আজিজুর রহমান ও যাত্রী এরশাদ আলী। এ ঘটনা গত ২৬ সেপ্টেম্বরের। যশোরের আরেক উপজেলা অভয়নগরের ভাঙ্গাগেট এলাকায় একটি ক্রসিংয়ে গত ১০ মে কয়লাবোঝাই একটি ট্রাককে ধাক্কা দিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে নিয়ে যায় ট্রেন। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান চালক মনোয়ার হোসেন। পঙ্গুত্ববরণ করেন চালকের সহকারী রায়হান।
শুধু এই দুটি ঘটনা নয়, বাংলাদেশ রেলওয়ে পাকশী বিভাগের পশ্চিমাঞ্চলের তথ্যমতে, যশোর রেলওয়ে স্টেশন থেকে যশোর-বেনাপোল, যশোর-কোটচাঁদপুর ও যশোর-খুলনা রুটের যশোর অংশে মোট ১৮৩টি রেলক্রসিং রয়েছে; এগুলোর মধ্যে ১০১টি অবৈধ। আর বৈধ যে ৮২টি রয়েছে, সেগুলোর ৩৮টির নেই কোনো গেটম্যান। ফলে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। এক দশকে এই অঞ্চলে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি। এতে প্রাণ হারিয়েছে ৭৫ জন।
দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে নামকাওয়াস্তে সতর্কতা সাইনবোর্ড বসালেও বেশির ভাগ বোর্ডের লেখা অস্পষ্ট আর নাজুক। অরক্ষিত ক্রসিংয়ে গেটম্যান না থাকায় মাঝেমধ্যে ঘটছে দুর্ঘটনা। অরক্ষিত ক্রসিংয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয়দের। রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, যেখানে-সেখানে রাস্তা নির্মাণের ফলে বাড়ছে অনুমোদনহীন ক্রসিং। এ জন্য স্থানীয়দের পাশাপাশি সড়ক নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের দুষছেন রেলের কর্মকর্তারা। তবে দায় এড়াচ্ছে এলজিইডিও। তারা বলছে, তাদের অধীনে সড়কগুলোর রেলক্রসিংগুলোকে গেটম্যান দিতে রেল বিভাগকে অবহিত করেও কাজে আসেনি। সরকারি এই দুই দপ্তরের সমন্বয়হীনতায় বছরের পর বছর প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ, এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রুহুল আমিন বলেন, সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। ফলে দিন দিন বাড়ছে অবৈধ এসব ক্রসিং। এসব ক্রসিং একেকটা মৃত্যুর ফাঁদ। দ্রুত এসব ক্রসিং বন্ধ করা কিংবা যাতায়াত নিরাপদ করতে উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি মানুষেরও সচেতন হতে হবে।
জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, যশোর-বেনাপোল রেললাইনে ২৮টি রেলক্রসিং রয়েছে। এ সময় চারটি স্থান বাদে বাকি ২৪টি স্থানে গেটবার দেখা যায়নি। ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পারাপার হচ্ছে পথচারীরা। যশোর-কোটচাঁদপুর রুটে খড়কিতে আধা কিলোমিটারের ভেতরে সাতটি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। রেলওয়ের ভাষায়, সবগুলো অবৈধ। এলজিইডি সড়কগুলো নির্মাণের সময়ে এসব ক্রসিংয়ের সৃষ্টি বলে জানান স্থানীয়রা।
যশোর পৌরসভার দক্ষিণ অংশের অনেক মানুষের শহরে প্রবেশদ্বার হলো খড়কি ধোপাপাড়ার সড়কটি। এই সড়কের মাঝ দিয়ে চলে গেছে যশোর-কোটচাঁদপুর রেলপথ। অথচ এই ক্রসিংয়ে নেই কোনো গেটম্যান। সতর্কতা সাইনবোর্ড থাকলেও বোর্ডের লেখা অস্পষ্ট আর নাজুক। গত বুধবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, রিকশা-ইজিবাইকসহ ব্যক্তিগত যানবাহন ক্রসিং পার হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে হঠাৎ করেই সাইরেন বাজিয়ে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন। সাহেব আলী নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, রেললাইন পার হতে গিয়ে এখানে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেই চলছে। এখানে বড় একটি বাঁক আছে, ফলে ট্রেন দেখা যায় না। স্থানটি খুবই দুর্ঘটনাপ্রবণ। স্থানীয়রা বলছেন, কয়েকবার রেল বিভাগের কাছে দাবি জানালে তারা জানায়, এলজিইডির কাছে যেতে। পরে তারাও একে ওপরকে দায় চাপিয়ে দেয়। বছরের পর বছর দুর্ঘটনা ঘটলেও কোনো দপ্তর আমলে নেয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তপপিডাঙ্গা এলাকার ভ্যানচালক আলম জানান, ‘এই গেটে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। গেটম্যান না থাকায় আমরা একজন দাঁড়িয়ে গেটম্যানের দায়িত্ব পালন করি। যখন কেউ থাকে না, তখন ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেই।’
রেলের যশোর অঞ্চলের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী চাঁদ আহমেদ বলেন, ‘অবৈধ গেটগুলো ব্যবহারের কারণে ঝুঁকি বাড়ছে। কোথাও কোথাও এসব ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিং সৃষ্টি করেছে পৌরসভা, এলজিইডি কিংবা স্থানীয়রা। সড়ক নির্মাণের আগে ও পরে আমরা এসব দপ্তরে চিঠি দিলেও বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ পথ। এগুলোর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
যশোর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘২০১৮ সালে গেটম্যান দিতে রেল বিভাগকে অবহিত করা হয়। সেই চিঠির এখন কী অবস্থা, সেটা আমার জানা নেই।’