পরিবারের স্বপ্নপূরণে সাত বছর ধরে সৌদি আরবে পরিশ্রম করছিলেন মো. আব্দুল্লাহ (৩০)। দেশে থাকা স্ত্রী, ছোট্ট মেয়েসন্তান ও বৃদ্ধ মা-বাবাকে ঘিরেই ছিল তাঁর ভবিষ্যতের সব পরিকল্পনা। কিন্তু সহকর্মীর জীবন বাঁচাতে গিয়ে সেই স্বপ্নের মাঝপথেই থেমে গেল তাঁর জীবন।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরবের রিয়াদে কর্মস্থলে কেমিক্যাল দূষণের ঘটনায় মারা যান আব্দুল্লাহ। সহকর্মীকে বাঁচাতে গিয়ে বিষাক্ত কেমিক্যালের সংস্পর্শে এসে তিনিসহ আরও তিনজন বিদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
আব্দুল্লাহ গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌর এলাকার দুর্বাটি গ্রামের সাবেক সেনাসদস্য মো. ইসমাঈল হোসেনের তৃতীয় ছেলে। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের মাতম। স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যেও বইছে শোকের আবহ।
নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় সাত বছর ধরে সৌদি আরবের রিয়াদে ‘আব্দুল লতিফ কোম্পানি’তে কাজ করছিলেন আব্দুল্লাহ। এ সময়ে দুবার দেশে ছুটিতে এসেছিলেন তিনি। সর্বশেষ এক মাস আগে ছুটি কাটিয়ে আবার সৌদি আরবে ফিরে যান। কে জানত, সেই ফেরাটিই হবে তাঁর জীবনের শেষ ফেরা।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে নিহতের বড় ভাই মো. আসাদুজ্জামান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ভাই সব সময় খুব পরোপকারী ছিল। সেদিন কর্মস্থলে কাজ করার সময় হঠাৎ একটি কেমিক্যাল গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানে একজন সহকর্মী গুরুতর আহত হন। আব্দুল্লাহ কোনো কিছু না ভেবে সেই বিপদগ্রস্ত সহকর্মীকে বাঁচাতে এগিয়ে যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে নিজেও ওই বিষাক্ত কেমিক্যালে আক্রান্ত হয়। তার সঙ্গে আরও তিনজন বিদেশি নাগরিকও আক্রান্ত হন। বিষাক্ত গ্যাস ও কেমিক্যালের তীব্রতায় ঘটনাস্থলেই আব্দুল্লাহসহ তাঁরা সবাই মারা যান।’
আব্দুল্লাহর মৃত্যুর খবর আসার পর থেকেই তাঁর বাড়িতে কান্না থামছে না। বৃদ্ধ মা-বাবার আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ। স্বজনদের শোক আরও গভীর করেছে তাঁর পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
আব্দুল্লাহর স্ত্রী বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা। তাঁদের আড়াই বছরের একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। বাবাকে হারানোর অর্থ বোঝার বয়স হয়নি ছোট্ট মেয়েটির। আর অনাগত সন্তানটি বাবার মুখ দেখার আগেই হারাল তাকে।
স্বজনেরা জানান, সন্তানের ভবিষ্যৎ ও পরিবারের স্বচ্ছলতার আশায় প্রবাসে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছিলেন আব্দুল্লাহ। স্ত্রী ও ছোট্ট মেয়েকে রেখে তাঁর এমন আকস্মিক চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা।
সহকর্মীর জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন হারানো আব্দুল্লাহর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রিয়াদে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
শোকার্ত পরিবারটি আব্দুল্লাহর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চেয়েছে।