ফরিদপুরে চেতনানাশক প্রয়োগ করে অচেতন করার পর ইজিবাইকচালক বিশ্বনাথ সরকারকে হত্যা করা হয়। ঘটনার চার বছর পর মুরাদ শেখ (৩৭) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআইয়ের ভাষ্য, মুরাদের অবস্থান শনাক্তে বিশ্বস্ত গুপ্তচর নিয়োগ করে টানা দুই বছর কাজ করতে হয়েছে।
গত বুধবার শহরের জনতা ব্যাংক মোড়সংলগ্ন ফলপট্টি এলাকা থেকে মুরাদকে গ্রেপ্তার করা হয়। মুরাদ ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদহ ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের সিরাজ শেখের ছেলে।
আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টায় সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ফরিদপুর পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ইজিবাইক ছিনতাই চক্রের সঙ্গে পাঁচজন জড়িত ছিলেন।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৬ জুলাই জীবিকার উদ্দেশ্যে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ইব্রাহীমদী গ্রামের বিশ্বনাথ সরকার (৫৫)। ওই দিন রাত আটটায় পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, বিশ্বনাথ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন।
পরিবারের সদস্যরা বিশ্বনাথকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ১৮ জুলাই কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন নিহতের ছেলে শ্রী রবি কুমার। ওই বছরের ১৯ অক্টোবর এই ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্তভার পায় পিবিআই।
এরপর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট ছিনতাই হওয়া ইজিবাইকের ক্রেতা কামাল মিয়াকে (৩৬) জেলা সদরের বাখুন্ডা বাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানান পুলিশ সুপার। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইজিবাইকটি উদ্ধার করা হয়।
পিবিআই পরে ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদহ গ্রামের ফিরোজ আহমেদের ছেলে সুমন আহমেদকে (৩৬) গ্রেপ্তার করে। পুলিশ সুপারের ভাষ্য, কামাল ও সুমনের দেওয়া স্বীকারোক্তিতে মুরাদসহ চারজনের নাম উঠে আসে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বরাতে পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনার দিন পাঁচজন মিলে ইজিবাইক ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন। সন্ধ্যায় শহরের গোয়ালচামট পুরাতন বাস টার্মিনাল থেকে ২০০ টাকায় বিশ্বনাথের ইজিবাইক ভাড়া করেন তাঁরা। নগরকান্দার তালমা মোড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়।
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক ধরে যাওয়ার সময় নির্জন স্থানে পৌঁছে রুমালে চেতনানাশক ওষুধ প্রয়োগ করে বিশ্বনাথের নাক-মুখে চেপে ধরা হয় বলে পিবিআইয়ের দাবি। অচেতন হয়ে পড়লে তাঁকে মহাসড়কের পাশে ফেলে রেখে ইজিবাইক নিয়ে চলে যান অভিযুক্তরা। স্থানীয় লোকজন বিশ্বনাথকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
পুলিশ সুপার জানান, ইজিবাইক ছিনতাইয়ের পর এর দাম ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করেন মুরাদ। চার সহযোগীকে ২৫ হাজার টাকা করে দিয়ে ইজিবাইকটি নিজের কাছে রাখেন তিনি। পরে কামালের কাছে ইজিবাইকটি ১ লাখ ১৭ হাজার টাকায় বিক্রি করেন।
রবিউল ইসলাম বলেন, কামাল ও সুমন গ্রেপ্তার হওয়ার পর মুরাদ সতর্ক হয়ে যান। তিনি বলেন, ‘সে অত্যন্ত ধুরন্ধর। সতর্ক হওয়ার পর থেকে দুই বছর আগে নিজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় মুরাদ। কখনো শ্বশুরবাড়িতেও যেত না। এমনকি তথ্যপ্রযুক্তি বা মুঠোফোন ব্যবহার করা বাদ দিয়েছিল। কারণ, মুঠোফোন ব্যবহার করলে সহজে তাকে শনাক্ত করতে পারব—এটা সে বুঝতে পারে। সে কারণে তাকে শনাক্ত করা আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যায়।’
পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘তাঁর পেছনে বিশ্বস্ত গুপ্তচর নিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘ দুই বছর কাজ করেছি। একপর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়াই লোকমুখে তাঁর গতিবিধি সম্পর্কে জানতে পারি এবং তাঁকে বুঝতেও দিইনি। খুব কৌশলে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই গ্রেপ্তার করি। এটা আমাদের জন্য একটি বড় অর্জন।’
পুলিশ সুপার জানান, মুরাদকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আগে গ্রেপ্তার হওয়া কামাল ও সুমন বর্তমানে জামিনে আছেন। বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক অখিল কুমার বিশ্বাসসহ বিভিন্ন ছাপা ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।