জিনের বাদশাহ পরিচয়ে গভীর রাতে বিশেষ করে নারীদের ফোন করা হতো। মোবাইল ফোনের পাশে অদ্ভুত শব্দ করে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হতো। মূল্যবান জিনিসপত্র হারানো বা জীবনের ঝুঁকির কথা বলে ভুক্তভোগীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হতো। পরে বিপদ মুক্তির আশ্বাস দিয়ে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে টাকা নেওয়া হতো। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন মোবাইল ফোনের নম্বর ক্লোন করেও চক্রটি বিকাশের মাধ্যমে ব্যবসায়িদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিত।
সম্প্রতি ডিজিটাল প্রতারক চক্রের দুই সদস্য সুমন ও রাজিবকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে তাদের প্রতারণার তথ্য। গ্রেপ্তার সুমন (২৬) ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন থানার ফুলকাচিয়া গ্রামের মৃত মোসলেম হাওলাদারের ছেলে। অপর ব্যক্তি মো. রাজিব (২৮) একই থানার মূলপাইততন গ্রামের রমজান মিয়ার ছেলে। গত সোমবার বোরহানউদ্দিন থানার কুঞ্জেরহাট বাজারের আশপাশ থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
আজ বুধবার দুপুর ১২টায় ফরিদপুর পিবিআই কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর রাজবাড়ী সদর থানায় হওয়া একটি মামলার সূত্র ধরে চক্রটিকে শনাক্ত করা হয়। মামলাটি করেন রাজবাড়ী সদর থানার বিনোদপুর এলাকার চাল ব্যবসায়ী রশিদুল ইসলাম। পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ চক্রটির ফাঁদে পড়েন তিনি।
পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম বলেন, বিজয় বাবু নামে পরিচিত এক ব্যবসায়ীর মোবাইল নম্বর ক্লোন করে চক্রটি রশিদুল ইসলামকে ফোন করে। জরুরি টাকার প্রয়োজনের কথা বলে সুলভ মূল্যে ৩৩টন চাল বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিকেল ৪টার মধ্যে চাল পৌঁছে দেওয়ার কথাও বলা হয়।
বিজয় বাবুর সঙ্গে আগে ব্যবসায়িক লেনদেন থাকায় প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন রশিদুল ইসলাম। ওই দিন দুপুরে চক্রটির দেওয়া আটটি বিকাশ ও নগদ নম্বরে কয়েক দফায় মোট ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পাঠান।
নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও চালের গাড়ি না আসায় বিজয় বাবুর কার্যালয়ে যান রশিদুল ইসলাম। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, এ ঘটনায় বিজয় বাবুর সঙ্গে তাঁর কোনো কথাই হয়নি। এরপর প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে রাজবাড়ী সদর থানায় মামলা করেন তিনি।
ওই মামলায় আট মাস তদন্তের পর কোনো আসামি গ্রেপ্তার ছাড়াই ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে আদালতে অভিযোগপত্র দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। আদালতের নির্দেশে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় ফরিদপুর পিবিআই। পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক মাজিদুল হক খান মামলাটি তদন্ত করেন।
পুলিশ সুপার বলেন, চক্রটির সারা দেশে নেটওয়ার্ক রয়েছে এবং পাঁচজন সদস্য রয়েছেন। সুমন বিভিন্ন বিকাশ ক্যাশআউট পয়েন্ট থেকে প্রতারণার টাকা সংগ্রহ করতেন। অন্য সদস্যরা ভুক্তভোগীদের তথ্য, মোবাইল নম্বর ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করতেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, চক্রের সদস্যরা কখনো জিনের বাদশাহ পরিচয়ে গভীর রাতে নারীদের ফোন করে প্রতারণার ফাঁদে ফেলতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তান্ত্রিক ও স্বনামধন্য কবিরাজ পরিচয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েও প্রতারণা করা হতো বলে জানান পুলিশ সুপার। কঠিন ও গোপন রোগের সমাধান, প্রেমে সফলতা এবং দাম্পত্য জীবনে সুখসহ নানা সমস্যা সমাধানের প্রলোভন দেখানো হতো।
সংবাদ সম্মেলনে ডিজিটাল লেনদেনে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান পুলিশ সুপার। চক্রটির অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক মাজিদুল হক খানসহ পিবিআইয়ের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।