হোম > সারা দেশ > দিনাজপুর

আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র, অনিশ্চয়তায় চার প্রজন্মের ঐতিহ্য

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি

স্বপন তবলা ঘরে কাজে ব্যস্ত রবিন দাস। ছবি: আজকের পত্রিকা

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী পৌরবাজারের ব্যস্ত এলাকা ননী গোপাল মোড়। চারপাশে দোকানপাট, মানুষের কোলাহল আর যানবাহনের শব্দ। এরই মধ্যে ছোট্ট একটি দোকান—‘স্বপন তবলা ঘর’। দোকানের দরজায় দাঁড়ালেই চোখে পড়ে তবলা, ডুগি, ঢোল, করতাল আর দোতারা। একসময় যেসব বাদ্যযন্ত্রের সুরে গ্রামবাংলার মেলা, যাত্রাপালা, কীর্তন ও সামাজিক অনুষ্ঠানের আসর জমে উঠত, সেগুলোই এখন অনেকটা নীরব।

দোকানটির মালিক রবিন দাস। চার প্রজন্ম ধরে তাঁর পরিবার যুক্ত এই পেশার সঙ্গে। কিন্তু দোকানের তাকজুড়ে সাজানো বাদ্যযন্ত্রগুলোর দিকে তাকালে এখন আনন্দের চেয়ে আক্ষেপই বেশি ফুটে ওঠে তাঁর চোখেমুখে।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের বিনোদনের ধরন। বিয়েবাড়ি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে এখন আধুনিক বাদ্যযন্ত্র, ডিজিটাল কি-বোর্ড, অর্কেস্ট্রা ও সাউন্ড সিস্টেমের দাপট। হাতে তৈরি তবলা, ঢোল কিংবা দোতারার আগের মতো চাহিদা নেই। কমেছে এসব বাদ্যযন্ত্র তৈরির কারিগরদের কাজও।

রবিন দাস জানান, তাঁর প্রপিতামহ (দাদুর বাবা) এই পেশা শুরু করেছিলেন। পরে দাদু ও বাবা সেই ঐতিহ্য ধরে রাখেন। তাঁদের কাছ থেকেই তিনি শিখেছেন বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামতের কাজ। ছোটবেলা থেকেই দোকান আর বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তাঁর বেড়ে ওঠা।

রবিন বলেন, ‘একসময় আমাদের দোকানের বেশ পরিচিতি ছিল। ফুলবাড়ী ছাড়াও আশপাশের উপজেলা, এমনকি দূরের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ বাদ্যযন্ত্র কিনতে আসতেন। তবলা, ডুগি, ঢোল, করতাল আর দোতারার ভালো চাহিদা ছিল। এখন সেই জৌলুশ আর নেই।’

দাদার মৃত্যুর পর তাঁর বাবা এই পেশায় ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পরও পৈতৃক পেশাটি আঁকড়ে ধরে রেখেছেন রবিন। তবে আগের মতো বিক্রি নেই। দোকানে তৈরি করে রাখা বাদ্যযন্ত্র অনেক সময় মাসের পর মাস অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে থাকে।

দোকানের একটি তবলার ওপর হাত রেখে রবিন বলেন, ‘আগে বিভিন্ন অনুষ্ঠান সামনে রেখে মানুষ তবলা, ঢোল কিংবা দোতারা কিনতেন। পালাগান, কীর্তন, বাউল আসর কিংবা গ্রামীণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এসব বাদ্যযন্ত্রের আলাদা মর্যাদা ছিল। এখন আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সহজলভ্যতায় সেই জায়গা অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সব জায়গায় এখন আধুনিকতার ছোঁয়া। বিয়ে থেকে শুরু করে গ্রামীণ যাত্রাপালা—সবখানেই কি-বোর্ড, অর্কেস্ট্রা আর ডিজিটাল সাউন্ডের ব্যবহার বেড়েছে। দেশীয় বাদ্যযন্ত্র এখন আর আগের মতো কেউ শুনতে বা কিনতে চান না। হাতে গোনা কিছু মানুষ এখনো এসব বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করেন।’

ফুলবাড়ী পৌরবাজারের ব্যস্ত এলাকা ননী গোপাল মোড়ে স্বপন তবলা ঘরে সাজানো দেশীয় বাদ্যযন্ত্র। ছবি: আজকের পত্রিকা

কথার একপর্যায়ে রবিনের কণ্ঠে জমে ওঠে অন্য রকম আক্ষেপ। চার প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পেশা তাঁর হাতেই থেমে যেতে পারে।

ছেলেমেয়েদের এই পেশায় আনবেন কি না, জানতে চাইলে রবিন বলেন, ‘না। তাদের পড়ালেখা শিখিয়ে চাকরি-বাকরি করতে দেব। এই কাজ করে এখন সংসার চালানো কঠিন।’

শুধু রবিন দাসের দোকান নয়, ফুলবাড়ীর বাদ্যযন্ত্র ব্যবসার সামগ্রিক চিত্রও বদলে গেছে। পৌরবাজারের ‘দাস মিউজিক্যালসের’ কর্ণধার ও সংগীতশিক্ষক প্রবীর কুমার দাস বাবুও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান।

তাঁর মতে, হাতে তৈরি বাদ্যযন্ত্রের বাজার সংকুচিত হওয়ার পেছনে আধুনিক প্রযুক্তির বড় ভূমিকা রয়েছে। এখন ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম, ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্র ও অর্কেস্ট্রা সহজেই পাওয়া যায়। ফলে অনুষ্ঠানের আয়োজকেরা আগের মতো দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ওপর নির্ভর করছেন না।

প্রবীর কুমার দাস বাবু বলেন, ‘কারিগর রেখে হাতে তৈরি বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে বিক্রি করেও এখন তেমন লাভ হয় না। তাই আমিও বাইরে থেকে বাদ্যযন্ত্র এনে বিক্রি করছি। দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি আমার দোকানে এখন আধুনিক ও ডিজিটাল বাদ্যযন্ত্রও জায়গা করে নিয়েছে।’

তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে সংকুচিত হচ্ছে শুধু একটি ব্যবসা নয়; হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা কারিগরি জ্ঞানও। একটি তবলা কীভাবে তৈরি করতে হয়, ঢোলের কাঠামো কেমন হবে, চামড়ার টান কতটা রাখতে হবে কিংবা দোতারার সুর কীভাবে ঠিক করতে হয়—এসব অভিজ্ঞতা কেবল বই পড়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের হাতে-কলমে কাজের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে এই দক্ষতা।

ফুলবাড়ীর ‘স্বপন তবলা ঘরের’ নীরব তাকগুলো তাই কেবল কয়েকটি বাদ্যযন্ত্রের গল্প বলে না; বলে একটি বদলে যাওয়া সময়ের গল্পও। যে দোকানে একসময় বাদ্যযন্ত্র কিনতে মানুষের ভিড় থাকত, সেখানে এখন বিক্রি কমার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

রংধনু ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের স্বত্বাধিকারী ও স্থানীয় সংগীতশিল্পী নাজমুল হাসান রতন বলেন, ‘একসময় যে সুরে গ্রামবাংলার মানুষের আনন্দ, উৎসব আর আবেগ মিশে থাকত, সেই সুর আজ আধুনিক শব্দের ভিড়ে ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। রবিন দাসের মতো কারিগরেরা পেশাটি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন ঠিকই, কিন্তু উত্তরসূরি না থাকলে তাঁদের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে এই শিল্পেরও একটি অধ্যায়।’