হোম > সারা দেশ > দিনাজপুর

দিনাজপুরের ১৩ উপজেলার মধ্যে অনলাইনে নেই খানসামার তথ্য, সেটেলমেন্ট সেবায় ভোগান্তি

এস. এম. রকি, খানসামা (দিনাজপুর)

খানসামা সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসারের কার্যালয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

ডিজিটাল সেবার যুগে ঘরে বসেই ভূমি রেকর্ড ও জরিপ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার সেবাগ্রহীতারা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উপজেলার ৫৭টি মৌজার মধ্যে ৫০টির গেজেট প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট তথ্য অনলাইনে সহজলভ্য নয়। ফলে প্রয়োজনীয় খতিয়ান, পরচা ও অন্যান্য তথ্যের জন্য সেবাগ্রহীতাদের সরাসরি সেটেলমেন্ট অফিসে যেতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে সময় ও যাতায়াত খরচ, পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি।

উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিস সূত্রে জানা যায়, খানসামার ৫৭টি মৌজার মধ্যে ৫০টির গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। আরও ছয়টি মৌজার গেজেট প্রকাশের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বাকি একটি মৌজার গেজেট এখনো প্রকাশিত হয়নি। গেজেট প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড ও জরিপ-সংক্রান্ত তথ্য অনলাইনে পাওয়ার সুযোগ থাকার কথা। তবে গেজেট প্রকাশিত মৌজাগুলোর তথ্যও অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে খতিয়ান অনুসন্ধান, মানচিত্র প্রদর্শনসহ বিভিন্ন ই-সেবার ব্যবস্থা রয়েছে। দিনাজপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের ওয়েবসাইটেও অফিসে না এসে অনলাইনে পরচা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু খানসামার প্রয়োজনীয় তথ্য অনলাইনে না থাকায় এসব সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

ওয়েবসাইটের ‘খতিয়ান অনুসন্ধান’ বিভাগে দেখা যায়, দিনাজপুর জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে ১২টির নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে। তালিকায় ০৫ নম্বরে বীরগঞ্জ ও ০৭ নম্বরে চিরিরবন্দর উপজেলার নাম থাকলেও ০৬ নম্বরে খানসামা উপজেলার নাম নেই।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে সরেজমিন উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, অফিসের কম্পিউটারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বিকল অবস্থায় রয়েছে। ফলে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার পরিবর্তে পুরোনো পদ্ধতিতে চলছে কার্যক্রম। জমির খতিয়ান, পরচা, নকশাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জন্য সেবাগ্রহীতাদের সরাসরি অফিসে এসে সংশ্লিষ্ট শাখায় যোগাযোগ করতে হচ্ছে।

হাসিমপুর মৌজার বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম জানান, জমিসংক্রান্ত সাধারণ তথ্যের জন্যও তাঁকে অফিসে এসে একাধিকবার যোগাযোগ করতে হয়। এক দিনে কাজ শেষ না হলে আবার আসতে হয়। এতে কর্মজীবী মানুষকে দিনের কাজ বাদ দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে দূরবর্তী ইউনিয়ন ও গ্রামাঞ্চল থেকে আসা কৃষক, শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের ভোগান্তি বেশি।

সেটেলমেন্ট ওয়েবসাইট। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে, জনবলসংকটেও ব্যাহত হচ্ছে অফিসের কার্যক্রম। অফিস সূত্রে জানা যায়, এখানে মোট ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ রয়েছে। তবে বিভিন্ন পদে জনবলসংকট রয়েছে। সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসারের পদে নিয়মিত কর্মকর্তা না থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন আব্দুর রহমান। তিনি সপ্তাহে এক দিন খানসামা অফিসে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি দিনাজপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের রেকর্ড কর্মকর্তা এবং বীরগঞ্জ উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসের দায়িত্বেও রয়েছেন।

অফিস সূত্র আরও জানায়, পেশকার, রেকর্ড কিপার ও জাজ মোহরার পদে একজন করে কর্মরত রয়েছেন। তবে বেঞ্চ সহকারী সাদেকুল ইসলাম সংযুক্তিতে দিনাজপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে কর্মরত। সার্ভেয়ার সামিউল ইসলাম সংযুক্তিতে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় এবং ড্রাফটসম্যান নবীউন নবী ঢাকায় কর্মরত রয়েছেন। অফিস সহায়ক পদে সংযুক্তিতে থাকা দুজন বর্তমানে খানসামায় কাজ করছেন।

এ ছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে একজন নিরাপত্তাপ্রহরী কর্মরত রয়েছেন। তবে পরিচ্ছন্নতাকর্মী বিজয় কুমার সংযুক্তিতে দিনাজপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে কর্মরত। প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতিতে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় চাপ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সরকারি সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, ভূমির মালিকদের খতিয়ান, পরচা ও নকশাসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সরেজমিনে খানসামা সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার কার্যালয়ে কোনো সিটিজেন চার্টার চোখে পড়েনি। অনলাইনে প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকা এবং সেবাসংক্রান্ত নির্দেশনা দৃশ্যমান না হওয়ায় সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি আরও বাড়ছে।

এর আগে ২০২৪ সালেও খানসামা সেটেলমেন্ট অফিসের সেবা নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দালালের দৌরাত্ম্য ও সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তির অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। সে সময় নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগও ওঠে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।

ছাতিয়ানগড় মৌজার বাসিন্দা সাদ বিন মাজিদ বলেন, গেজেট প্রকাশিত মৌজাগুলোর ভূমি রেকর্ড ও জরিপসংক্রান্ত তথ্য দ্রুত অনলাইনে হালনাগাদ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিকল কম্পিউটার ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সচল করা এবং জনবলসংকট দূর করা গেলে সেবার মান বাড়বে। এতে ঘরে বসে তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং বারবার অফিসে এসে সময় ও অর্থ ব্যয়ের ভোগান্তিও কমবে।

সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার আব্দুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘তথ্য অনলাইনে হালনাগাদ হওয়ার আগেই খানসামা উপজেলার সর্বশেষ ভূমি জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। যেসব মৌজার গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর রেকর্ড জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কালেক্টরেটের রেকর্ডরুমে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে অনলাইনে তথ্য হালনাগাদের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেখভাল করবে।’

অনলাইনে তথ্য হালনাগাদ না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে দিনাজপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার শাজাহান আলী মোবাইল ফোনে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

খানসামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুজ্জামান সরকার বলেন, ‘সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি লাঘবে বিষয়টি সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে। যাতে উপজেলার মানুষ ঘরে বসেই সেটেলমেন্ট অফিসের প্রয়োজনীয় সেবা পেতে পারেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’