হোম > সারা দেশ > কুমিল্লা

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান, এক রাতে আটক ৬২৪

 কুমিল্লা প্রতিনিধি 

পুলিশের অভিযানে আটককৃত কিশোররা। ছবি: সংগৃহীত

স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লাজুড়ে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান শুরু করেছে জেলা পুলিশ। বুধবার সন্ধ্যার পর জেলার ১৮টি থানায় একযোগে শুরু হওয়া এ অভিযানে রাত দেড়টা পর্যন্ত ৬২৪ জনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীও রয়েছে। অপরাধে তাদের সম্পৃক্ততা যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তবে অভিযানকে কেন্দ্র করে দাউদকান্দিতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেখানে ৫৯ কিশোরকে আটকের পর তাদের ছেড়ে দেওয়ার দাবিতে অভিভাবক ও স্বজনেরা থানায় ঢুকে হট্টগোল ও ভাঙচুর করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সময় কয়েকজন কিশোর থানার ভেতর থেকে পালিয়ে যায় বলেও জানা গেছে।

পুলিশ বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উঠতি বয়সী কিশোরদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন মহল থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় একযোগে অভিযান চালানো হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান বলেন, পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের নির্দেশে জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালানো হয়েছে। কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের তৎপরতার তথ্য রয়েছে—এমন এলাকাগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। আটক ব্যক্তিদের আগের কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় ৭৫ জন, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ৪৬, বুড়িচংয়ে ৫০, মনোহরগঞ্জে ৪১, দাউদকান্দিতে ৫৯ এবং লাকসামে ৩৫ জনকে আটক করা হয়েছে। বাকি থানাগুলোতে আটক ব্যক্তিদের তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে শিক্ষার্থী কারা, তা যাচাই করা হচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেলে তাকে আদালতে পাঠানো হবে। অন্যদের সতর্ক করে অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়া হতে পারে।

অভিযান শুরুর পর রাত ৮টা থেকে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানা, সদর দক্ষিণ মডেল থানাসহ বিভিন্ন থানার সামনে অভিভাবকদের ভিড় দেখা যায়। সন্তান আটকের খবর পেয়ে অনেক অভিভাবক থানায় ছুটে যান। গভীর রাত পর্যন্ত অনেকে থানার বাইরে অপেক্ষা করেন।

দাউদকান্দি থানায় হট্টগোল-ভাঙচুরের অভিযোগ

কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে বুধবার রাতে দাউদকান্দি মডেল থানায় হট্টগোল ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।

পুলিশ জানায়, সন্ধ্যা থেকে দাউদকান্দি মডেল থানা ও গৌরীপুর তদন্তকেন্দ্রের পুলিশ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫৯ কিশোরকে আটক করে। খবর পেয়ে তাঁদের অভিভাবক ও স্বজনেরা থানায় জড়ো হন। একপর্যায়ে তাঁরা থানার ভেতরে ঢুকে আটক কিশোরদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেন। এতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

থানার আসবাব ও দরজা-জানালায় ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। এ সময় কয়েকজন আটক কিশোর থানার ভেতর থেকে পালিয়ে যায় বলেও জানা গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে থানার ভেতরে নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোরসহ বিপুলসংখ্যক মানুষকে অবস্থান করতে দেখা যায়। থানার বিভিন্ন কক্ষেও লোকজনের উপস্থিতি দেখা গেছে।

দাউদকান্দি মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম পলাশ বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ধরতে সন্ধ্যা থেকে থানা ও গৌরীপুর তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ অভিযান চালায়। অভিযানে ৫৯ জনকে আটক করা হয়। খবর পেয়ে তাঁদের অভিভাবকেরা থানায় এসে হট্টগোল শুরু করেন।

ওসি বলেন, এ সময় একটি পুরোনো দরজার অংশ খুলে যায় এবং লোকজনের ভিড়ে কয়েকটি চেয়ার উল্টে যায়। আটক কিশোরদের বিষয়ে তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর কোনো অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে না, তাঁদের অভিভাবকদের কাছ থেকে লিখিত নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।

অপ্রতিম হত্যার পর নতুন করে আলোচনায় কিশোর গ্যাং

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন নয়। তবে গত শুক্রবার ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান এবং কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর অপ্রতিম নিখোঁজ হয়। পরদিন সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অপর একজনকে হত্যাকাণ্ডের সহযোগী হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন কিশোর।

অপ্রতিম হত্যার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন মহল থেকে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। এর মধ্যেই বুধবার রাতে জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান শুরু করে পুলিশ।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা যাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে, সে জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হবে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, গত বছরের ৩০ নভেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ২৫০ জনের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিশোর হওয়ায় তাঁদের অনেকে গ্রেপ্তারের পর দ্রুত মুক্তি পেয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অনেকের মা-বাবাকে ডেকে মুচলেকাও নেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সুপার বলেন, কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি অভিভাবকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।