‘আমি এখন নিঃস্ব, কোথায় থাকব, তা-ও জানি না।’ পদ্মার ভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে এমনই অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়নের বাদশাপাড়ার বাসিন্দা বাবুল আলীর। চার দশক ধরে যে ভিটায় সংসার করেছেন, তিন সপ্তাহ আগে সেটিও নদীতে বিলীন হয়েছে। স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে এখন আশ্রয় নিয়েছেন স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে।
এর আগেও দুবার নদীভাঙনের কারণে বাড়ি সরাতে হয়েছিল বাবুলকে। এবার হারিয়েছেন শেষ আশ্রয়টুকু। ভাঙনের সময় ঘরের কিছু জিনিসপত্র সরাতে পারলেও সবকিছু রক্ষা করতে পারেননি। এখন মাঝেমধ্যে নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ান তিনি। যেখানে একসময় ছিল তাঁর ঘরবাড়ি, সেখানে এখন বইছে পদ্মার স্রোত।
বাবুল আলী বলেন, ‘ভোররাতে হঠাৎ ভাঙন শুরু হয়। মাইকিং শুনে মানুষজন যে যেভাবে পেরেছে, জিনিসপত্র সরিয়েছে। কিন্তু এত অল্প সময়ে সবকিছু নেওয়া সম্ভব হয়নি। কিছু জিনিস নিতে পেরেছি, আর কিছু পানিতে ভেসে গেছে।’
বাবুলের দাবি, তাঁর বাবার প্রায় ৪০ বিঘা জমি ইতিমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে। বসতভিটা হারানোর পর এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি সহায়তা পাননি বলেও অভিযোগ তাঁর। তিনি বলেন, ‘সরকার ২০১৯ সাল থেকে বাঁধ নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে আসছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত বাঁধ হয়নি। এখন শুনছি, বাঁধের জন্য টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু এখন বাঁধ দিয়ে কী লাভ? আমার তো ভিটেমাটিই নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।’
দুর্লভপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম আজম বলেন, চলতি বছর তাঁর ইউনিয়নে প্রায় ৪০টি বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে, পাশাপাশি হারিয়ে গেছে শত শত বিঘা ফসলি জমি। এখনো ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর নদীভাঙনে মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। শত শত বিঘা ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীতে চলে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য সরকারকে বারবার জানাচ্ছি, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা দেখছি না।’
চেয়ারম্যান আরও বলেন, ভাঙন ঠেকাতে চলমান প্রকল্পের পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কথা থাকলেও এখনো তা করা হচ্ছে না।
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দুর্ভোগ শুধু ঘর হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বসতভিটার সঙ্গে অনেকের হারিয়ে যাচ্ছে চাষাবাদের জমি, আয়ের উৎস ও সঞ্চিত সম্পদ। নতুন করে ঘর তুলতে অর্থের পাশাপাশি নিরাপদ জমিও প্রয়োজন। সর্বস্ব হারানো দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য দুটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম বলেন, পাকা ইউনিয়নে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৪৫০টি পরিবারকে ত্রাণসহায়তা দেওয়া হয়েছে। দুর্লভপুর ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা তৈরির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকা পাওয়ার পর তাঁদের ত্রাণসহ সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান মিশুক বলেন, শিবগঞ্জের পাকা ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন অংশে নদীভাঙনে প্রায় দেড় শ বাড়ি বিলীন হয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকা সুরক্ষায় একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেয়েছে। তিনি বলেন, প্রকল্পের আওতায় পদ্মার বাম তীরে মনোহরপুর থেকে পাকা ইউনিয়ন পর্যন্ত ৫ দশমিক ৭৪০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ করা হবে। এ ছাড়া নদীর ডান তীরে ৩ দশমিক শূন্য ৯ কিলোমিটার প্রতিরক্ষামূলক কাজ করা হবে। আগের নির্মিত নদীতীর রক্ষা বাঁধের প্রায় ৫০০ মিটার অংশও সংস্কার করা হবে।
প্রকল্পের ২৪টি প্যাকেজের দরপত্রপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। বাকি প্যাকেজগুলোর প্রক্রিয়া চলছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
তবে আপাতত জরুরি ভিত্তিতে নদীভাঙন ঠেকাতে নতুন কোনো প্রকল্প নেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা। অনুমোদিত প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হবে।