হোম > সারা দেশ > বান্দরবান

যেখানে স্বাস্থ্যসেবা ‘এখনো দুর্গম পথের ওপারে’

মংবোওয়াংচিং মারমা অনুপম, থানচি

পাখির চোখে বড় মদক বাজার ও মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো সম্প্রীতি গ্রাম। ছবি: আজকের পত্রিকা

অবাস্তব মনে হলেও তথ্য প্রযুক্ত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে সামান্য চিকিৎসাসেবা পেতে তাঁদের পাড়ি দিতে হয় ৭০ কিলোমিটার পথ। অসুস্থ শরীরে দুর্গম পাহাড়ি ও নৌপথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে তবেই পৌঁছানো যায় থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম রেমাক্রী ইউনিয়নের মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বড় মদক ও আশপাশের প্রায় ৬০ গ্রামের মানুষের একমাত্র ভরসা।

বড় মদক, ছোট মদক, সাঙ্গু রিজার্ভ, তিন্দু ইউনিয়নের কিছু অংশ ও আন্ধারমানিকসহ আশপাশের দুর্গম এলাকায় ১০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। এলাকাগুলোতে প্রতিবছর ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হামসহ নানা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও নেই কোনো স্থায়ী হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ফলে প্রাথমিক চিকিৎসা থেকে শুরু করে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, টিকাদান কর্মসূচিসহ সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে আছে এ অঞ্চল।

দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। বর্ষাকালে নদীপথের ঝুঁকি ও পাহাড়ি সড়কের দুরবস্থা দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসা নিতে দেরি হওয়ায় অনেক রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে রেমাক্রী ও তিন্দু ইউনিয়নে ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হামসহ নানা রোগে আক্রান্ত শতাধিক রোগী চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারায় নদীপথে মারা গেছেন।

পানঝিরি পাড়ার বাসিন্দা বুলু ম্রো বলেন, প্রতিবছর বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এলাকায় পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ে। ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ নানা রোগে বিভিন্ন বয়সী মানুষ আক্রান্ত হন। শিশুদের মধ্যেও হামসহ সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ে। কাছাকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় অসুস্থ মানুষকে দুর্গম পাহাড়ি পথ ও নদীপথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে যেতে হয়।

পাখির চোখে বড় মদক বাজার ও মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো সম্প্রীতি গ্রাম। ছবি: আজকের পত্রিকা

রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা (রনি) বলেন, বড় মদক ও আশপাশের এলাকায় পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না থাকায় জরুরি চিকিৎসার অভাবে প্রতিবছরই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

মুইশৈথুই মারমা বলেন, বড় মদকে একটি হাসপাতাল স্থাপন জরুরি। সরকারি উদ্যোগে হাসপাতালটি হলে বড় মদক, ছোট মদকসহ সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ প্রয়োজনীয় ও জরুরি চিকিৎসাসেবা পাবেন।

বড় মদক গ্রামের বাসিন্দা মংমে মারমা ও জাপরাং পাড়ার বাসিন্দা অলসেন ত্রিপুরা জানান, রেমাক্রী ইউনিয়নের দুর্গম ও গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী এলাকা বড় মদক। সেখানে হাসপাতাল স্থাপন করা হলে বুলুপাড়া, আন্ধারমানিক, ছোট মদক, বড় মদকসহ তিন্দু ইউনিয়নের আশপাশের দুর্গম এলাকার মানুষ দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাবেন।

মদক বাজারের বাসিন্দা চসিংমং মারমা বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও সীমান্তবর্তী বড় মদকের মানুষের জন্য সেই অধিকার এখনো দুর্গম পথের ওপারে। অস্থায়ী চিকিৎসা কার্যক্রম দিয়ে দীর্ঘদিনের এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বড় মদকে সরকারি উদ্যোগে একটি স্থায়ী হাসপাতাল স্থাপনের পাশাপাশি চিকিৎসক, ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।’

বিএনপির সাধারণ সম্পাদক উবামং মারমা বলেন, চিকিৎসার জন্য আর কত দিন ৭০ কিলোমিটার দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে? আর কত প্রাণ ঝুঁকিতে পড়লে বড় মদকে স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাবে?

উবামং মারমা বলেন, সীমান্তবর্তী এ জনপদের মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় মদকে সরকারি হাসপাতাল স্থাপন এখন সময়ের দাবি।

থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ওয়াহিদুজ্জামান মুরাদ বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান, পাড়াপ্রধান ও শিক্ষিত তরুণদের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই বড় মদকে হাসপাতাল স্থাপনের আবেদন করা হয়েছে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।