ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্তত দুই প্রার্থী তাদের দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য হলফনামায় গোপন করেছেন। এ ছাড়া প্রার্থীদের কেউ কেউ তাঁদের সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
আজ বৃহস্পতিবার প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে প্রস্তুত করা ‘হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ ও কেওয়াইসি (KYC) ড্যাশবোর্ড উন্মোচন উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির উপদেষ্টা ও নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর জাফর সাদিকসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২১ জন প্রার্থী তাঁদের দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। তবে টিআইবির কাছে এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে—অন্তত দুই প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও তা হলফনামায় উল্লেখ করেননি। টিআইবির নীতিমালার কারণে এসব প্রার্থীর পরিচয় প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ওই দুই প্রার্থী ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন বা এখনো আছেন, কিন্তু বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছে। এ সংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, এক প্রার্থীর নির্ভরশীলের নামে যুক্তরাজ্যে প্রায় ২১০ কোটি টাকার সম্পদ থাকলেও তা হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি। অন্য এক প্রার্থী নিজের ও স্ত্রীর নামে বিদেশে কোনো সম্পদ নেই বলে ঘোষণা দিলেও দুবাইয়ে তাঁর স্ত্রীর নামে একটি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, তাদের কাছে এমন তথ্যও রয়েছে—একজন প্রার্থী বিদেশে তিনটি ফ্ল্যাটের মালিকানা থাকার কথা স্বীকার করলেও প্রকৃত সংখ্যা কমপক্ষে তিনগুণ এবং সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের সম্ভাব্য পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। আবার এক প্রার্থী বিদেশে নিজস্ব মালিকানায় কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই বলে দাবি করলেও অনুসন্ধানে তাঁর মোট ১১টি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৮টি সক্রিয় বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত।
এ ছাড়া, এক প্রার্থীর করস্বর্গে কোম্পানি নিবন্ধনের পুরোনো তথ্য থাকলেও হলফনামায় এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি বলেও জানায় টিআইবি।
প্রার্থীদের তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং নির্বাচন কমিশন (ইসি) ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৮১ জন। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশের বেশি প্রার্থীর মূল পেশা ব্যবসা। রাজনৈতিক পেশাকে মূল পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন মাত্র ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ প্রার্থী। আইন ও শিক্ষক পেশার প্রার্থীর হার যথাক্রমে ১২ দশমিক ৬১ ও ১১ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
এবারের নির্বাচনে প্রথমবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট করছেন ১ হাজার ৬৯৬ জন প্রার্থী। বিগত পাঁচটি নির্বাচনের তুলনায় এবার স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী প্রার্থীর সংখ্যাও সর্বাধিক।
সম্পদের হিসাবে দেখা গেছে, অস্থাবর ও স্থাবর সম্পত্তির ভিত্তিতে কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা ৮৯১ জন। এর মধ্যে ২৭ জন প্রার্থীর সম্পদের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার বেশি। প্রার্থীদের মধ্যে ৫৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এ ছাড়া ২৫৯ জন প্রার্থীর তুলনায় তাঁদের স্বামী বা স্ত্রী নির্ভরশীলদের অস্থাবর সম্পদ বেশি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ১১৮ জন প্রার্থীর তুলনায় তাঁদের স্বামী-স্ত্রী নির্ভরশীলদের দালান বা ফ্ল্যাটের সংখ্যা বেশি এবং ১৬৪ জন প্রার্থীর তুলনায় নির্ভরশীলদের জমির পরিমাণ বেশি। টিআইএন (TIN) প্রদান করেছেন ৯৭ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রার্থী।