পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের টিকে থাকার স্বার্থে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। মতাদর্শ, প্রতিষ্ঠান কিংবা সংগঠনভেদে বিভক্তি থাকলেও পেশাগত স্বার্থে সাংবাদিকদের অবস্থান হওয়া উচিত অভিন্ন। আজ শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত গণমাধ্যম সম্মিলন-২০২৬-এ এসব কথা বলেন বক্তারা।
মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর সংগঠিত হামলার প্রতিবাদ এবং স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জানাতে যৌথভাবে এ সম্মিলন আয়োজন করে সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) এবং সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ। সকাল ১০টায় সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সম্মিলনের সূচনা হয়। এরপর কোন প্রেক্ষিতে এই সম্মিলন আয়োজন করা হচ্ছে তা নিয়ে একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে শুরু হয় বক্তব্য পর্ব।
সূচনা বক্তব্যে সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা এবং অগ্নিসংযোগ কোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি ছিল মধ্যযুগীয় বর্বরতার প্রকাশ। সমাজে ভিন্ন মত থাকবে, ভিন্ন কণ্ঠ থাকবে, ভিন্ন ভিন্নভাবে মানুষ কথা বলবে। এই বৈচিত্র্য জারি রাখাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিকতায় পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার গুরুত্ব দিয়ে প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমান বলেন, ‘আপনাদের যখন দালাল বলা হয়, আমার দুঃখ লাগে এবং বলবেই না কেন! যারা ছিল কয়দিন আগে আওয়ামী লীগের পক্ষে তারা সবাই হয়ে গেল এখন বিএনপির পক্ষে, এটা একটা অদ্ভুত ঘটনা নাকি এটা ম্যাজিক। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, সাংবাদিকতা এখনো বাংলাদেশে সম্মানজনক পেশা হয়ে ওঠেনি। অথচ তাদের সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি।’
দৈনিক প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে আগামী সরকার এলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। অতীতে হয়নি, এখনো হচ্ছে না, ভবিষ্যতেও হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। ঐক্য, সমঝোতা ও সংহতিই এই সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।’
ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘একটি সরকার যদি সত্যিকার অর্থে স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করে এবং উদার গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে, তবে সেই সরকারই সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়।’
বর্তমান পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা ঐক্যবদ্ধ না থাকা বলে মন্তব্য করেন ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের (বিজেসি) সভাপতি ও মাছরাঙা টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক রেজওয়ানুল হক রাজা।
সংকট মোকাবিলায় বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের জন্য একটি ফোরাম গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
চট্টগ্রামভিত্তিক দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, প্রকৃত সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হলে তথ্যের শূন্যতা তৈরি হয়, যা ভুয়া নিউজ বা ভুয়া তথ্য দিয়ে পূরণ হয়। এতে সমাজে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা বাড়ে, যা কখনোই কল্যাণ বয়ে আনে না।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের সুরক্ষায় একটি আইন প্রণয়নের সুপারিশ করা হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি, যদিও সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
জাতীয় প্রেসক্লাব সভাপতি ও দৈনিক কালের কণ্ঠ সম্পাদক হাসান হাফিজ বলেন, আমরা জুলাইয়ের চেতনার নামে যা দেখেছি—গরু কোরবানি দেওয়া, মধ্যরাতে অফিসে আক্রমণ, আগুন দেওয়া-এগুলো নজিরবিহীন, খুবই মর্মান্তিক। এমন ঘটনার কারণে বিশ্ববাসীর কাছে মুখ দেখানোর মতো অবস্থা আমাদের নেই।
ভবিষ্যতে যারা জনগণের ম্যান্ডেট পাবে তারা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য একটি পরিবেশ তৈরি করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ। বলেন, যারা জনগণের ম্যান্ডেট পাবে, তারা যেন আমাদের এই কথাগুলো শুনে স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য একটা পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করেন।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের ওপর ওপর আঘাত আসলে, দল মতের ঊর্ধ্বে থেকে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে সেটা প্রতিরোধ করব, প্রতিবাদ করব।
ইংরেজি দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রকাশক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, সামনে যে নির্বাচন আসছে, সেখানে যেন মানুষ নির্ভয়ে কথা বলতে পারে। এই অধিকার যেন প্রতিষ্ঠা হয়, এটাই আমাদের আশা-প্রত্যাশা।
দৈনিক করতোয়া সম্পাদক মোজাম্মেল হক বলেন, যদি আমরা মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক-সবাই ঐক্যভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাই, তাহলে সাংবাদিকের উন্নয়ন এবং সংবাদপত্রের উন্নয়ন সম্ভব।
রংপুরের দৈনিক যুগের আলোর সম্পাদক এবং প্রকাশক মমতাজ শিরীন বলেন, গণমাধ্যমকে রক্ষা করতে গেলে সর্বপ্রথম যে কাজটা করতে হবে সেটা হলো একে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত করা।
নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সহ-সভাপতি মুনিমা সুলতানা বলেন, সাংবাদিকদের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব থেকে বের হয়ে এসে পেশাদারিত্বের জায়গা তৈরি করতে হবে। পেশাদারিত্বের জায়গা আমাদেরই তৈরি করতে হবে।
গাজীপুরের শ্রীপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি এস. এম. মাহফুল হাসান হান্নান বলেন, সত্যিই ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। অধিকার কেউ কাউকে বিলিয়ে দেয় না, আদায় করে নিতে হয়। আমাদের অধিকার আমাদেরই আদায় করে নিতে হবে।
লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আ হ ম মোশতাকুর রহমান বলেন, আমরা যদি অন্তরকে পরিষ্কার না করি, আমরা যদি দলীয় সংকীর্ণতা থেকে দূরে সরে আসতে না পারি তাহলে কোনোভাবেই আমাদের ঐক্য সফলতার মুখ দেখবে না।
সম্মিলনে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, আমার দেশের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, সিলেট মিরর সম্পাদক আহমেদ নূর, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ এবং দেশের একাধিক আঞ্চলিক সংবাদপত্রের সম্পাদক ও প্রতিনিধি।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক বণিক বার্তা-র সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। তিনি জানান, আগামী ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে একটি চার্টার বা ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে।
দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার জন্য একসঙ্গে দাঁড়ানোর এ আয়োজনে নোয়াব ও সম্পাদক পরিষদের সব সদস্য, অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স, ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার, জাতীয় প্রেসক্লাব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ডিপ্লোমেটিক করেসপনডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম, ফটো জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন, ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা এবং ঢাকার বাইরে কর্মরত সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের সম্পাদক-প্রকাশকদের অংশ নেন।