দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাবে গত বছর শীর্ষে ছিল বরগুনা জেলা। একই জেলা চলতি সময়ে হামের প্রকোপেও শীর্ষে রয়েছে। এরই মধ্যে এই জেলায় ৩ জন হামে আক্রান্ত শিশু মারা যাওয়ার তথ্য দিয়েছে জেলা সিভিল সার্জন দপ্তর। জেলায় প্রতিদিন হামে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, যাদের মধ্যে শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি আশঙ্কাজনক। ডেঙ্গুর পর আবার হামও আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে বরগুনাবাসীর জন্য।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের টিকা গ্রহণের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতা, মায়ের শালদুধ না খাওয়ানোর প্রবণতায় শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি না হওয়া, স্বাস্থ্য দপ্তরের দুর্বল নজরদারির কারণে এই জেলায় হামের প্রকোপ বেড়েছে।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নতুন করে ৩৬ জন ও তালতলী হাসপাতালে ১ জন হামে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে।
এদিকে হামে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ২ শিশু মারা গেছে। একই সময়ে সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় হামের হালনাগাদ করা এ তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে ১১৮টি শিশু সন্দেহজনক হামে মারা গেছে। তাদের মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ২০ শিশু। গতকাল সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে সন্দেহজনক হামে ১ হাজার ২৮২ শিশু রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৮০ শিশুর। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম শনাক্ত হয়েছে ৮ হাজার ৫৩৪ জনের। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৯৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২২ দিনে সারা দেশের সরকারি হাসপাতালে সন্দেহজনক হামে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ৯৪০।
বরগুনায় হামের সংক্রমণ নিয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য গবেষক মো. তারিকুল ইসলাম লিমন আজকের পত্রিকাকে বলেন, সারা দেশে হামের সংক্রমণ বেড়েছে; তবে বরগুনা জেলায় কী কারণে একটু বেশি, এ বিষয়ে গবেষণা প্রয়োজন। সারা দেশে হামে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার কারণ হচ্ছে টিকা না নেওয়া। ৯ মাস থেকে হামের টিকা দেওয়া শুরু হয়; আবার ১৫ মাসে একটি দেওয়া হয়। অনেক অভিভাবক ৯ মাসেরটা দিলেও ১৫ মাসেরটা দেয় না।
তবে তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কমিউনিটিতে শিশুদের হার্ট ইমিউনিটি কেমন আছে, এ বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করতে হবে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আমরা ৯ মাস থেকে শিশুদের হামের টিকা দিচ্ছি; তবে বর্তমানে ৩ মাস কিংবা ৪ মাসের শিশুদেরও হাম হচ্ছে। এ বিষয়েও গবেষণা প্রয়োজন। গবেষণা করে প্রকৃত কারণ শনাক্ত করার পর ভ্যাকসিন শিডিউল পরিবর্তন করতে হবে কি না, সেটিও গবেষণার বিষয়।’
এই গবেষক বলেন, ‘বরগুনা জেলায় ডেঙ্গু নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে জেনেছি, এখানকার অনেকে স্বাস্থ্যসচেতন নয়। এখানে শিশুর মায়ের পুষ্টির অভাব ও শিশুদের জন্মের পরে শালদুধ না খাওয়ানোর প্রবণতা রয়েছে। ফলে শিশুরা মায়ের শরীর থেকে অ্যান্টিবডি না পাওয়ায় টিকা গ্রহণের সময় হওয়ার আগেই তারা হামে আক্রান্ত হতে পারে। তাই এ বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করা হলে সঠিক কারণ জানা যাবে এবং কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।’
এরই মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই জেলাকে হামের হটস্পট ঘোষণা করছে। জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এখন পর্যন্ত উপসর্গ নিয়ে আসা ১৬৫ জনের মধ্যে ৩৫ জনের হাম এবং ১ জনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। এর বাইরে ৭৫ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
এর আগে বরগুনায় ডেঙ্গুর রেকর্ডও খারাপ ছিল। জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বরগুনায় ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করেছিল। সরকারি হিসাবে জেলায় প্রায় ৯ হাজার ৭৪৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ ছিল। শুধু তা-ই নয়, গত বছর জেলায় সরকারি হিসাবে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১৫ জন; তবে বেসরকারি হিসাবে এই মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫৭।
গত বছরের ডেঙ্গু মহামারির রেশ কাটতে না কাটতেই এ জেলায় নতুন হামের প্রকোপ বাড়ায় জনমনে উদ্বেগ বিরাজ করছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, হামে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য জেলায় ৩৭টি শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বরগুনা জেলাকে হামের হটস্পট ঘোষণার পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই জেলায় হামের টিকা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জেলা সদরের ৪০টি কেন্দ্রে গত রোববার থেকে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে; চলবে সরকারি বন্ধ ও ছুটি বাদে মোট ২১ দিন।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হওয়া ৮ মাস বয়সী শিশু রেশমীর মা মরিয়ম বেগম বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে আমার মেয়ের জ্বর। গায়ে অ্যালার্জি জাতীয় ফোসকা উঠছে। মেয়ের টিকা নেওয়ার সময় না হওয়ায় এত দিন হামের টিকা দিইনি। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরে গতকাল টিকা দিয়েছি।’
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট আশিকুর রহমান বলেন, গবেষণা অনুযায়ী একজন আক্রান্ত রোগী ১৬-১৮ জনকে আক্রান্ত করতে পারে। সাধারণত হাঁচি, কাশি এবং সরাসরি রোগীর সংস্পর্শের মাধ্যমে হাম ছাড়ায়।
হাম পরিস্থিতি নিয়ে বরগুনার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. রেজওয়ানুর আলম বলেন, প্রাদুর্ভাব শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে ১৫ শয্যার দুটি আলাদা ওয়ার্ড চালু করা হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও ১৫টি শয্যা বাড়ানো হয়েছে। তবে বরিশালে হাম শনাক্তের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা না থাকায় নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়।
বরগুনার সিভিল সার্জন আবুল ফাত্তাহ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘অনেক শিশুর অভিভাবক হামের ৯ মাসের টিকা দেওয়ার পরে ১৫ মাসেরটা আর শিশুদের দিতে যাননি। এ কারণে হামে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে পারে। তবে সঠিক কী কারণে হাম বেড়েছে, সেটি আইইডিসিআরের প্রতিনিধিরা গবেষণা করলে জানা যাবে। আমরা টিকা কার্যক্রম শুরু করেছি। যারা আগে টিকা পেয়েছে, তাদেরকেও এর আওতায় এনেছি। হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড খুলেছি। আশা করি, করোনা ও ডেঙ্গুর মতো হামেরও মোকাবিলা করতে আমরা সক্ষম হব।’
এদিকে গতকাল সকালে বরগুনা ২৫০ শয্যা হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক শ্যামল কান্তি মণ্ডল। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘৪ বছর পরপর আমাদের ক্যাম্পেইন (টিকা কর্মসূচি) হওয়ার কথা। যেকোনো কারণে সেটি ডিলে (দেরি) হয়েছে। যাহোক, যেকোনো সমস্যা এলেও আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ও পরামর্শে সেটি মোকাবিলার চেষ্টা করি। আশা করি হাম মোকাবিলাও আমরা ভালোভাবে করতে পারব।’