বিয়ে মানেই নতুন জীবনের স্বপ্ন, আনন্দ আর উৎসব। রায়হান কবিরের জীবনেও তেমনই এক রঙিন মুহূর্ত আসার কথা ছিল। কিন্তু ১ আগস্টের সেই রাতটি তাঁর জীবনে বয়ে এনেছে এক চরম নাটকীয়তা এবং শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াই। বাসররাতে নববধূ মুখ ধোয়ার পরই বরের দাবি—বিয়ের আগে যাকে দেখানো হয়েছিল, এই নারী তিনি নন।
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ভাণ্ডার এলাকায় ঘটে যাওয়া এই চাঞ্চল্যকর ‘কনে বদল’ বিতর্ক এখন পুরো জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে।
এই রহস্যজনক ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি মামলায় গতকাল সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আদালত বর রায়হান কবিরের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
ঘটনার নেপথ্যে: সন্দেহের সূত্রপাত
মামলার বিবরণ ও বরের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১ আগস্ট পীরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর এলাকার মৃত ইব্রাহীমের ছেলে রায়হান কবিরের সঙ্গে রাণীশংকৈলের জিয়ারুল হকের মেজো মেয়ের বিয়ে হয়। পাত্রপক্ষ জানায়, জুলাই মাসের শেষে ঘটক মোতালেবের মাধ্যমে পাত্রী দেখার প্রক্রিয়া শুরু হয়। শিবদিঘী এলাকার একটি চায়ের দোকানে পাত্রী দেখানো হয়েছিল এবং তখন রায়হান ও তাঁর স্বজনেরা মেয়েটিকে পছন্দ করেন।
এরপর কনেপক্ষ তাড়াহুড়ো করে বিয়ের তারিখ চূড়ান্ত করার অনুরোধ জানায়। ১ আগস্ট রাত ১১টায় বরযাত্রীসহ জিয়ারুল হকের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। বরের মামা বাদলের অভিযোগ, ‘বিয়ের সময় কনের মুখ অতিরিক্ত মেকআপ দিয়ে ঢাকা ছিল। ফলে কনে পরিবর্তনের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের কারো চোখে পড়েনি। কিন্তু ভোর ৪টার দিকে বাড়ি ফেরার পর বাসররাতে নববধূ মুখ ধোয়ার সাথে সাথেই রায়হান আঁতকে ওঠে। সে দাবি করে, এই মেয়েকে আগে দেখানো হয়নি; যাকে দেখানো হয়েছিল সে অন্য কেউ।’
পরদিন ২ আগস্ট বরপক্ষ মেয়েটিকে তাঁর বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় এবং পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা দাবি করে। বরের পরিবারের দৃঢ় বিশ্বাস, ঘটক ও মেয়ের বাবা পরিকল্পিতভাবে এই প্রতারণার জাল বুনেছেন।
কনেপক্ষের দাবি
কনে বদলের এই গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন কনের বাবা জিয়ারুল হক। তিনি পাল্টা দাবি তুলেছেন, এটি মূলত যৌতুক আদায়ের কৌশল। জিয়ারুল হক বলেন, ‘আমার তিন মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় মেয়ে জেমিন আক্তার স্থানীয় কলেজে পড়ে। মেজ মেয়েকে পাত্রপক্ষ আমাদের বাড়িতে এসেই দেখে গিয়েছিল। বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রায় ৭০ জন বরযাত্রীর সামনে এমন কনে বদলের অভিযোগ হাস্যকর এবং অবিশ্বাস্য।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিয়ের পরদিনই বরপক্ষ ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। সেই টাকা দিতে না পারার কারণেই এখন তাঁর মেয়েকে অপবাদ দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং সামাজিকভাবে তাঁকে হেয় করা হচ্ছে।
আইনি লড়াই
ঘটনাটি মীমাংসার জন্য স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশি বৈঠক বসলেও কোনো সমাধান আসেনি। পরে গত ২৭ আগস্ট কনের বাবা জিয়ারুল হক বর রায়হান কবির ও তার দুলাভাই মানিক হাসানের বিরুদ্ধে যৌতুক ও নির্যাতনের মামলা করেন। এর পাল্টা জবাবে ২ সেপ্টেম্বর রায়হান কবিরও কনের বাবা ও ঘটককে আসামি করে প্রতারণার মামলা করেন। উভয় মামলার শুনানি শেষে আদালত গতকাল সোমবার রায়হানকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ঠাকুরগাঁও আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও বরের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন গণমাধ্যমকে জানান, প্রথম দিকে মীমাংসার শর্তে বর জামিনে থাকলেও কোনো সুরাহা না হওয়ায় মামলাটি এখন পূর্ণাঙ্গ বিচারের অধীনে।
এদিকে ঘটক মোতালেব এই বিতর্কের দায় নিতে নারাজ। তাঁর দাবি, তিনি বরের বাড়িতেই মেয়ে দেখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন এবং এরপরের কোনো ঘটনার দায় তাঁর নয়।