হোম > সারা দেশ

হাওরাঞ্চল: ধানের সঙ্গে শ্রমিকের মজুরিও কৃষকের লোকসানের খাতায়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

পানিতে ডুবে থাকা হাওর থেকে ধান কেটে পাশের সড়কে তুলছেন কৃষক। গতকাল নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার জগন্নাথপুর এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

ভারী বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় এখনো তা কেটে ঘরে তুলতে পারেননি হাওরাঞ্চলের অনেক কৃষক। আবার যাঁরা বাড়তি মজুরি দিয়ে ধান কেটে তীরে বা রাস্তায় রেখেছিলেন, তাও নষ্ট হয়ে গেছে। আর তাই কৃষকেরা আক্ষেপ করে বলছেন, যাঁরা তলিয়ে যাওয়া ধান কাটেননি, তাঁদের বরং কম ক্ষতি হয়েছে। যাঁরা ধান কেটেছিলেন, তাঁদের ক্ষতি দ্বিগুণ—ধানও গেছে, ধান কাটা শ্রমিকের মজুরিও গেছে।

নেত্রকোনার হাওরাঞ্চল খালিয়াজুরী, মদন ও মোহনগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাওর ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর এলাকার কৃষক বাদল মিয়া বলেন, ‘১ হাজার ৫০০ টাকা রোজে শ্রমিক দিয়ে চার একর জমির ধান কেটে বাড়ির সামনে স্তূপ করে রেখেছি। বৃষ্টির জন্য শুকাতে পারিনি। এখন দেখছি স্তূপের মধ্যে ধানে অঙ্কুর গজাচ্ছে। বাকিগুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আরও কয়েক একর জমির ধান তলিয়ে গেছে। চোখের সামনে কষ্টের ফসল নষ্ট হতে দেখেও কিছু করতে পারছি না।’

অপর কৃষক আঙ্গুর মিয়া বলেন, এখন অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে যাঁদের ধান তলিয়ে গেছে, তাঁরাই ‘ভাগ্যবান’। কারণ অতিরিক্ত মজুরি দিয়ে যাঁরা জমির ধান কেটেছিলেন, তাঁদের ধান স্তূপেই পচে ধ্বংস হয়েছে। তলিয়ে গেলে শুধু ধানই গেল, আর কাটলে ধানের সঙ্গে মজুরিও।

মদন উপজেলায় উচিতপুর এলাকার কৃষক আ. বারেক বলেন, ‘উচিত হাওরে অর্ধেক জমির ধান পানির নিচে। তিন একর জমির ধান কেটে আনতে পেরেছি। তবে রোদের কারণে ধান শুকাতে পারছি না। বাকি দুই একর জমির ধান পানির নিচে।’

কলমাকান্দা উপজেলার বরখাপন ইউনিয়নের উদয়পুর গ্রামের কৃষক রমজান আলী বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে পারছি না। ধানে অঙ্কুর গজাচ্ছে। চোখের সামনে কষ্টের ফসল নষ্ট হচ্ছে।’

নেত্রকোনা জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, জেলার সব নদনদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত ১১ হাজার ৩২০ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে কিছু জমির ধান কাটা যাবে আর কিছু জমির ধান নষ্ট হবে।

একই অবস্থা সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার কৃষকদেরও। ধান কাটার চেয়ে শুকানোর কাজে বেশি ব্যস্ত তাঁরা। বেশি দিন স্তূপে থাকায় চারা গজানোর পাশাপাশি অঙ্কুরিত (গেরা) ধান নিয়ে কষ্টে আছেন কৃষক। ফলনের মায়ায় নষ্ট ধান রোদে মেলে নাড়াচাড়া করছেন কৃষক পরিবারের লোকজন।

তাহিরপুর থেকে শনি হাওরমুখী চলা গোবিন্দশ্রী সড়কে চারা গজানো ধান রোদে শুকানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কৃষক মিজানুর রহমান। হতাশাগ্রস্ত চেহারায় তিনি বলেন, ‘জমি করছিলাম ৮ কিয়ার (৩০ শতকে ১ কিয়ার)। ৩ কিয়ার ডুইব্যা গেছে। এইখানে ৫ কিয়ার জমিনের ধান আছে। এইডি কাটতে-আনতে খরচ হইছে ২১ হাজার টেকা। ভাঙ্গানির পরে ১৩-১৪ দিন টালে (স্তূপ) থাইক্যা গেরা হইয়া চারা হইছে। রইদে দিয়া যাতে কিছুডা বাঁচানো যায়, এই চেষ্টা করতাছি। এ ছাড়া তো গতি নাই।’

পরিবারের লোকজন নিয়ে তাহিরপুর-ফতেপুর সড়কে ধান মেলছিলেন তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের মধ্য তাহিরপুর গ্রামের কৃষক মো. শাহজাহান মিয়া। তাঁর আবাদ করা সব জমি শনির হাওরে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২৮ কিয়ার জমির মধ্যে প্রায় সবটুকুই কাটা হয়েছে। কাটানির পরে এই পর্যন্ত আনতে খরচ হয়েছে প্রায় ২ লাখ টাকা। গেরা গজিয়ে এখন সব নষ্ট হওয়ার পথে। খোরাক বাঁচানোর লাগি রোদে দেওয়ার চেষ্টা করতাছি। সারা হাওরেরই একই অবস্থা।’

গতকাল দুপুরে শনি হাওরের একাংশ ঘুরে দেখা যায়, নিয়ামত বাজার থেকে তাহিরপুর পর্যন্ত সড়কে শত শত নারী-পুরুষ ধান শুকানোর কাজ করছিলেন।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৪০০ কোটি টাকার মতো হতে পারে। ধান কাটাতে কৃষকের গতি আনতে হবে।

এ ছাড়া মৌলভীবাজারের হাওর এলাকার কৃষকেরা জানান, যেসব কৃষক কষ্ট করে বুকসমান পানি থেকে ধান কেটে এনেছিলেন, তাঁদের ধান রোদের অভাবে নষ্ট হচ্ছে। অনেক ধান থেকে চারা গজিয়েছে। আবার বেশির ভাগ ধান হাওরের পানির নিচে তলিয়ে আছে। জেলায় অন্তত ২০ হাজার কৃষক একেবারে ধান হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, জেলায় ২ হাজার ৫৯৭ হেক্টর জমির ধান পচে নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির সংখ্যা আরও বাড়বে। প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

এ ছাড়া কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে গত কয়েক দিনে ১৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান ডুবে গেছে। এই তথ্য জানিয়ে জেলা কৃষি বিভাগ বলছে, এর মধ্যে বেশি খারাপ অবস্থা ইটনার হাওরে; যেখানে সাড়ে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমি তলিয়ে গেছে। হাওরে এখনো ৩৯ শতাংশ ধান কাটা বাকি।

এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক জমিতে ধান কাটার যন্ত্র (হারভেস্টার) নামানো যাচ্ছে না। আবার যেখানে নামানো যাচ্ছে, সেখানে প্রতি একরে ৬-৭ হাজার টাকার ভাড়া চাওয়া হচ্ছে ২০-২৫ হাজার টাকা।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘জেলায় আনুমানিক ৫০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা মাঠপর্যায়ে তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছি।’

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি]

ধাত্রী দিবস আজ: প্রসূতিদের পাশে ‘জননী’ নুরজাহান

মানিকগঞ্জের ঘিওর: খানাখন্দে ভরা সড়ক, দুর্ভোগে চালক-যাত্রী

কোটি টাকা নিয়ে উধাও ‘তিশা’, দিশেহারা গ্রাহক

এবার বিলের ধানও ডুবল ঢলের পানিতে

খাগড়াছড়িতে টিসিবির পণ্য কিনতে লাইনে ১৩ ঘণ্টা, ঘরে অনাহারে ছিল শিশুরা

চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে: ইবিতে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী

ধান কাটার সময় অসুস্থ হয়ে হাওরে ডুবে শ্রমিকের মৃত্যু

খুলনায় যুবক গুলিবিদ্ধ

ধানের খড় রাখা নিয়ে দ্বন্দ্ব, বৃদ্ধকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

ডেমরার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ শ্রমিকের মৃত্যু, ছিল না ফায়ার সেফটি প্ল্যান