হোম > শিল্প-সাহিত্য

স্বীকৃতি পেল ইসলামপূর্ব আরবের কবিতায় মৌমাছি, যুদ্ধ ও আত্মগরিমার গল্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: দ্য ন্যাশনাল

এবার অন্য ভাষায় আরবি সাহিত্য বিভাগে আরব বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও সবচেয়ে বেশি অর্থমূল্যের সাহিত্য পুরস্কার ‘শেখ জায়েদ বুক অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে জার্মান আরবি ভাষাবিদ স্টেফান ভাইডনারের একটি সংকলন। ‘Der Arabische Diwan: Die Schönsten Gedichte aus Vorislamischer Zeit’ বা ‘দ্য আরব দিওয়ান: প্রাক্-ইসলামি যুগের সবচেয়ে সুন্দর কবিতা’ শিরোনামের গ্রন্থটি মূলত ইসলামপূর্ব আরবের কবিতার একটি সংকলন।

ইসলামের আবির্ভাবের বহু আগে, প্রায় দেড় হাজার বছর আগে আরবের কবিরা শুধু প্রেম, যুদ্ধ কিংবা বীরত্বের কথা লিখতেন না; তাঁদের কবিতায় উঠে এসেছে মৌমাছি ও মধু সংগ্রহকারী, পাখির উড়াল, ঘোড়ার গতি ও চলন এবং আরবের মরুভূমিতে বিচরণকারী নানা প্রাণীর কথাও। এসব কবিতা থেকে প্রাক্-ইসলামি আরবের প্রকৃতি, সমাজ, জীবনসংগ্রাম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়।

জার্মান আরবি ভাষাবিদ স্টেফান ভাইডনারের মতে, সেই সময়ের মানুষ টিকে থাকার প্রয়োজনেই তাদের চারপাশের প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। মরুভূমির কঠিন পরিবেশে প্রাণী, উদ্ভিদ, আবহাওয়া ও ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে না জানলে বেঁচে থাকা কঠিন ছিল। তাই তাঁদের কবিতায় প্রকৃতির সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়।

ভাইডনার বলেন, তাঁরা আধুনিক অর্থে বিজ্ঞান জানতেন না, কিন্তু তাঁদের পর্যবেক্ষণ ছিল অনেকটা বৈজ্ঞানিক মনোভাবের মতো। প্রকৃতিকে গভীরভাবে দেখা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান অর্জন ছিল তাঁদের জীবনের অংশ।

এই দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন রয়েছে ভাইডনারের সংকলন ‘দ্য আরব দিওয়ান: প্রাক্-ইসলামি যুগের সবচেয়ে সুন্দর কবিতা’ গ্রন্থে। প্রায় এক হাজার পঙ্‌ক্তির এই সংকলনে প্রাচীন আরবি কবিতাকে আধুনিক জার্মান ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে।

ভাইডনার মনে করেন, সে সময় আরব সমাজে কবিতার ভূমিকা আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদপত্র, সরকারি যোগাযোগ, কূটনীতি, যুদ্ধের প্রচারণা ও বিজ্ঞাপনের সম্মিলিত রূপের সঙ্গে তুলনীয় ছিল। কবিরা নিজেদের শক্তি ও মর্যাদা প্রচার করতেন, প্রতিপক্ষকে সতর্ক করতেন কিংবা নিজেদের বীরত্বের গল্প তুলে ধরতেন।

কোনো কবিতায় একজন যোদ্ধা দাবি করতেন, তাঁর তলোয়ারই সবচেয়ে শক্তিশালী—এমনকি সেটি ভারতে তৈরি, যা সে সময় উৎকৃষ্ট অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হতো। আবার কিছু কবি নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করতেন, যেন তাঁরা একাই পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সক্ষম।

সংকলনে ‘সা’লিক’ নামে পরিচিত সমাজের প্রান্তিক বা গোত্রের সুরক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন কবিদের রচনাও রয়েছে। তাঁরা নিজেদের প্রায় ‘আইনবহির্ভূত’ বা স্বাধীন যোদ্ধা হিসেবে তুলে ধরতেন। অন্য দিকে ইমরু আল-কায়েসের মতো কবিরা তাঁদের অভিযান, প্রেম ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা কবিতায় প্রকাশ করেছেন।

এসব রচনা প্রাক্-ইসলামি আরবকে সাংস্কৃতিকভাবে অনুন্নত বা জ্ঞানহীন সমাজ হিসেবে দেখার ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করে। কবিতাগুলো থেকে বোঝা যায়, ওই অঞ্চলের মানুষ রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতেন এবং নিজেদের চারপাশের প্রকৃতি ও সমাজ সম্পর্কে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন।

তবে কবিতাগুলো সেই সময়ের সহিংসতাকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ সংঘাত, হত্যা ও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অপমানজনক বক্তব্য ছিল সমাজজীবনের বাস্তবতা। কবিতায় রক্তপাত, বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও যুদ্ধের ভয়াবহ দৃশ্যের বর্ণনাও রয়েছে।

ভাইডনার মনে করেন, ইসলামের আবির্ভাব এই বিশৃঙ্খল বাস্তবতার মধ্যে নিয়ম, শৃঙ্খলা ও আধ্যাত্মিকতার একটি নতুন কাঠামো তৈরি করেছিল। তাঁর মতে, ইসলামের মাধ্যমে আরব সমাজে শান্তি ও মানসিক স্থিতির নতুন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রাচীন আরবি কবিতার প্রতি ভাইডনারের আগ্রহ তৈরি হয় মুঘল সাম্রাজ্য নিয়ে গবেষণার সময়। ইউরোপে আরবি সাহিত্য কীভাবে পরিচিত হয়েছিল, তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি পুরোনো জার্মান অনুবাদগুলোর সন্ধান পান। কিন্তু উনিশ শতকের ভাষাশৈলী তাঁর কাছে আধুনিক পাঠকের জন্য দুরূহ মনে হয়। তাই তিনি নতুন করে অনুবাদের উদ্যোগ নেন।

তাঁর এই কাজের স্বীকৃতি শেখ জায়েদ বুক অ্যাওয়ার্ড। ভাইডনারের কাছে পুরস্কারটির গুরুত্ব শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যে নয়; বরং আরব ও ইউরোপীয় সংস্কৃতির মধ্যে সাহিত্যিক সংলাপের স্বীকৃতি হিসেবেও। তাঁর মতে, দেড় হাজার বছর আগের আরব কবিতা আজও জীবন্ত—কারণ তা এখনো আরব বিশ্বের মানুষের সাংস্কৃতিক স্মৃতি, ভালোবাসা ও পরিচয়ের অংশ।