হোম > শিল্প-সাহিত্য

মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পজগৎ: পাপেট বাড়ির ‘বাসিন্দাদের’ ভবিষ্যৎ নিয়ে দুর্ভাবনা

শরীফ নাসরুল্লাহ, ঢাকা

খ্যাতিমান শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার গড়ে তুলেছিলেন পাপেটের এক জগৎ। প্রয়াত এই শিল্পীর বাসায় এখনো রয়েছে তৈরি বিভিন্ন শিল্পকর্ম। ছবি: আজকের পত্রিকা

পড়েছেন চিত্রকলায়। কিন্তু শিল্পের খুব কমই শাখা আছে, যেখানে মুস্তাফা মনোয়ার হাত দেননি। শুধু হাত দেওয়া নয়, স্বকীয়তার ছাপ রেখেছেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে পাপেট-সংশ্লিষ্টতাই তাঁকে সারা দেশের ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ করে তুলেছিল।

বেশ পরিণত বয়সেই গত ২৯ জুন চিরবিদায় নিয়েছেন মুস্তাফা মনোয়ার। রেখে গেছেন নিজের তৈরি বিখ্যাত পাপেট চরিত্রগুলোকে। ধানমন্ডির বাড়িময় তাদের বর্ণাঢ্য উপস্থিতি। সম্প্রতি এক বিকেলে সেখানে ঢুঁ মেরে কথা হলো শিল্পীর পরিবারের সদস্য আর পাপেট তৈরি দলের সহশিল্পী-কারিগরদের সঙ্গে। জানা গেল, মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পিত অসমাপ্ত কিছু কাজের বাস্তবায়ন আর তাঁর পাপেটজগতের সংরক্ষণ নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন তাঁরা।

বৃষ্টিভেজা বিকেলে ধানমন্ডির পুরোনো ধাঁচের বাড়িটির নিচতলায় পা রাখতেই দেখা গেল, রং গোলাচ্ছেন দুজন কর্মী। তাঁদের নির্দেশনা দিচ্ছেন শিল্পীর সহযাত্রী অনুকূল চন্দ্র দাস। নব্বইয়ের দশকে চারুকলায় পড়ার সময় থেকেই মুস্তাফা মনোয়ারের কাজের সঙ্গী তিনি। অনুকূল নিজেই ঘুরে দেখালেন শিল্পীর পাপেট বাড়ি।

মুস্তাফা মনোয়ারের বাড়ির দুটি তলায় গড়ে উঠেছে তাঁর শিল্পের ভুবন। নিচতলায় স্টুডিও। কয়েকটি কক্ষে এলোমেলো পড়ে আছে কাজের হরেক সরঞ্জাম। পুরো স্টুডিওতে আকাশি-নীলের ক্যানভাস। ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া কিছু অংশে নতুন রঙের পোঁচ দিচ্ছিলেন একজন। ওপরে সার বাঁধা আলোকসম্পাতের যন্ত্র। অনেক স্ট্যান্ড দাঁড় করানো। দু-একটা কৃত্রিম গাছ। বোঝা গেল, বিটিভির জনপ্রিয় পাপেট শো ‘মনের কথা’র শুটিং হতো এখানেই।

অনুকূল চন্দ্র জানালেন, শিল্পীর মৃত্যুর পর থেকে গত কয়েক মাসে কোনো কাজ হয়নি। তবে আবার শুটিং শুরু হবে। তাই গোছগাছ চলছে। অনুকূল সহকর্মীদের কিছু নির্দেশনা দিয়ে এ প্রতিবেদককে নিয়ে চললেন ওপরের তলায়। সেখানেই দেখা মিলল ‘পাপেট বাড়ি’ নামের অদ্ভুতুড়ে একটি কক্ষের। কক্ষটিকে ‘যন্তরমন্তর গৃহ’ বললে ভুল হয় না। চারদিকে নানা ধরনের ধাতব যন্ত্র—হাতুড়ি, বিভিন্ন ধরনের বাটালি, স্ক্রু ড্রাইভার, ড্রিল মেশিন, প্লায়ার্স, কাঠ কাটার নানা যন্ত্র। ঘরের এক কোণে একটা পুরোনো লেদ মেশিনও। মাথার ওপরের তাকে থরে থরে সাজানো বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, কাপড়ের বান্ডিল, কাঠের ছোট ছোট গুঁড়ি, পাপেট তৈরির নানা সরঞ্জাম।

অনুকূল বললেন, পাপেট শো টিভিতে দেখতে সহজ হলেও এর পেছনের খাটুনিটা বিশাল। একটা পাপেট চরিত্র বানাতেই দেড় মাসের বেশি সময় লাগে। শুধু বানালেই শেষ না, পরে মহড়া বা ট্রায়ালও দিতে হয়। কারণ একটা পাপেট চরিত্রে যতটা সম্ভব জ্যান্ত মানুষ বা প্রাণীর ভাবটা নিয়ে আসতে হয়। তাকে সেভাবে নড়াচড়া করাতে হয়। ভুল হলে সব খুলে আবার নতুন করে করতে হয়। তার মানে শুধু শৈল্পিক নয়, কারিগরি একটা দিকও থাকে প্রতিটা পাপেটের পেছনে।

পাপেটের প্রতিটা অংশই ওয়ার্কশপ ঘরে বসে নিজে নির্দেশনা দিয়ে বানাতেন মুস্তাফা মনোয়ার। নিজেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে কাজ করতেন। জাপানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নিজে আনিয়েছিলেন যন্ত্রগুলো।

পাপেট বাড়িতে এখনো আছে শিল্পীর তৈরি করে যাওয়া প্রায় এক শ পাপেট। ঘরে ঢুকলেই চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে সার বেঁধে ঝোলানো বর্ণিল মুখ। কারও ঠোঁটে হাসি, কারও মুখ হাঁ হয়ে আছে যেন এখনই কথা বলে উঠবে। কারও হাত-পা আবার ঝুলছে নিষ্প্রাণ ভঙ্গিতে। এখানেও টেবিলে ছড়িয়ে আছে ছেনি, তুলি, রঙের কৌটা, সেলাই কাটার সরঞ্জাম। দেখা গেল ‘মনের কথা’র জনপ্রিয় চরিত্র পারুল, বাউল ভাই ও ষাঁড়কে।

নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে এই ‘পাপেট বাড়ি’ গড়ে তুলেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।

কক্ষটিতে একটি সেকেলে কাঠের আলমারির গায়ে কয়েকটি কাগজ সাঁটানো। তাতে লেখা পাপেট চলচ্চিত্র ‘বীর পুরুষ’-এর কয়েক ধাপের কাজের বিবরণ। অনুকূল জানান, পাপেট চরিত্র ও সত্যিকার অভিনেতাদের সমন্বয়ে রবীন্দ্রনাথের শিশুতোষ কবিতা ‘বীর পুরুষ’কে চলচ্চিত্রে রূপ দিতে চেয়েছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। ইচ্ছা ছিল কবিগুরুর আরেক বিখ্যাত চরিত্র ‘সুভা’ নিয়েও পাপেট চলচ্চিত্র করার। কিন্তু সেগুলো পরিকল্পনাই থেকে গেল।

অনুকূল চন্দ্র বলেন, ‘পাণ্ডুলিপি তৈরি থেকে শুরু করে পাপেট ক্যারেক্টার তৈরির কাজ আমরা অনেকটাই এগিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্যার আর কাজটি শেষ করে যেতে পারেননি। কেউ উদ্যোগ নিলে, আমাদের সহযোগিতায় কাজটি শেষ হতে পারে।’

পাপেট বাড়ি পেরিয়ে অনুকূল নিয়ে যান আরেকটি ঘরে। সেটি অডিও স্টুডিও। সেখানে রাখা অডিও রেকর্ডিংয়ের যন্ত্রপাতি। জানা গেল শিল্পী নিজেই পাপেট শোর সংগীত পরিচালনা করতেন। কম বয়সে রেকর্ডিং কোম্পানি হিজ মাস্টার্স ভয়েসে প্রতিযোগিতার সেরা গায়ক হওয়া মানুষটির কাছে এটাই তো স্বাভাবিক। এই সংগ্রহ, এই কর্মযজ্ঞের নমুনা পাপেট নিয়ে কতটা ধ্যানমগ্ন ছিলেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার তাই সবার সামনে তুলে ধরে। কিন্তু শিল্পীর অনুপস্থিতিতে এই সংগ্রহশালা বা অসমাপ্ত কাজের কী হবে? অনুকূল চন্দ্র বললেন, ‘যত দিন পারা যায় পাপেটের কাজ চালিয়ে যাব। স্যার যে কাজ রেখে গেছেন, তা যেন থেমে না যায় দেখব। তবে আর্থিক বিষয়টা একটা সমস্যা। কীভাবে এ সমস্যা মেটানো যাবে তার এখনো কিছুই জানি না।’

শিল্পীর সৃষ্টিগুলো নিয়ে জাদুঘর তৈরির কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, এমন প্রশ্ন করে জানা গেল পাপেটের কাজ যেহেতু চলবে, সেহেতু পরিবার এখনই সে জন্য প্রস্তুত নয়। তবে সংগ্রহ থেকে কিছু পাপেট জাদুঘরে রাখার পরিকল্পনা তাদের আছে।

স্বয়ং মুজতবা আলী তরুণ বয়সেই তাঁর প্রতিভার আভাস পেয়ে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ছাড়িয়ে ভর্তি হতে বলেছিলেন আর্ট কলেজে। সেই থেকে শুরু। দীর্ঘ জীবনে শিল্পের নানা ক্ষেত্রে বিচরণ করেছেন সাফল্যের সঙ্গে। বিটিভির জন্য তাঁর তৈরি করা ‘রক্তকরবী’ নাটক প্রশংসা কুড়িয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের মতো কৃতী মানুষের। বিনোদনের গণ্ডি ছাড়িয়ে পাপেট শোকে পরিণত করেছিলেন দারুণ গণশিক্ষার মাধ্যমে। সেই মুস্তাফা মনোয়ারের সৃষ্টিকর্মের প্রসার ও সংরক্ষণ নিশ্চয়ই জাতীয় স্বার্থেই প্রয়োজন।