হোম > বিশ্লেষণ

গাজায় গণহত্যা যেভাবে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনে টেনে এনেছে নিরীহ ব্রিটিশদের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

লন্ডনে ফিলিস্তিন অ্যাকশনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবিতে অনুষ্ঠিত এক বিক্ষোভে পুলিশ এক বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে। ছবি: আল-জাজিরা

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও এর ফলে ব্যাপক প্রাণহানির প্রভাব ব্রিটেনের রাজনীতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও গভীর প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। একসময় রাজনীতি থেকে দূরে থাকা বহু ব্রিটিশ নাগরিক এখন ফিলিস্তিনিদের পক্ষে আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছেন। কেউ রাস্তায় বিক্ষোভ করছেন, কেউ চিঠি লিখছেন আইনপ্রণেতাদের, আবার কেউ নিষিদ্ধ সংগঠনকে সমর্থনের অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঝুঁকিও নিচ্ছেন।

স্কটল্যান্ডের এডিনবরার কাছে বসবাসকারী ৫২ বছর বয়সী ক্লেয়ার তাঁদেরই একজন। প্রশাসনিক কাজে যুক্ত এই নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন না। কুকুর, বই পড়া ও রান্নাবান্না নিয়ে শান্ত জীবন কাটানো ক্লেয়ার তিন বছর আগেও নিজেকে রাজনৈতিক মানুষ মনে করতেন না। নিরীহ মানুষটির এখন নিষিদ্ধঘোষিত ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-এর প্রতি সমর্থন দেখানোর অভিযোগে সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

ক্লেয়ার জানান, ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে ফিলিস্তিনি চিকিৎসক ইজ্জেলদিন আবুয়ালাইশের লেখা ‘আই শ্যাল নট হেট’ বইটি পড়ার পর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। ইসরায়েলি ট্যাংকের গোলাবর্ষণে ওই চিকিৎসকের তিন কন্যা প্রাণ হারিয়েছিল। বইটি পড়ার পর থেকেই ইসরায়েলে হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলা ও এর পরবর্তী ঘটনাবলি অনলাইনে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ শুরু করেন তিনি।

২০২৩ সালের আর্মিস্টিস ডেতে যুদ্ধবিরতির দাবিতে ফিলিস্তিনপন্থী সমাবেশেও যোগ দেন ক্লেয়ার। তৎকালীন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুয়েলা ব্রেভারম্যান বিক্ষোভগুলোকে ‘ঘৃণার মিছিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করলে তিনি আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। পরে তিনি মিছিলে নিয়মিত অংশ নেওয়া, আইনপ্রণেতাদের চিঠি লেখা ও ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় অর্থ সংগ্রহ শুরু করেন।

২০২৫ সালের আগস্টে ‘ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদে অংশ নেন ক্লেয়ার। সংগঠনটির দাবি, নাগরিক অবাধ্যতার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য তারা আন্দোলন করছে। এ পর্যন্ত সংগঠনটির প্রতি সমর্থন প্রদর্শনের অভিযোগে তিন হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কলচেস্টারের ৭০ বছর বয়সী মারজির গল্পও একই রকম। জীবনে কখনো বিক্ষোভে অংশ না নেওয়া এই নারী ২০২৩ সালের আর্মিস্টিস ডেতে ‘সিজফায়ার নাও’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নামেন। তাঁর বাবা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ও শ্বশুর রয়্যাল এয়ারফোর্সে কর্মরত ছিলেন। তাঁর ভাষায়, তাঁদের আগের প্রজন্ম ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল; অথচ এখন ব্রিটেনেই আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

গত জুলাই মাসে ওয়েস্টমিনস্টারে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১২ নম্বর ধারায় মারজি ও তাঁর স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এখন তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে কি না, তা নিয়ে অপেক্ষা করছেন তাঁরা।

বর্তমানে শিল্পী, রেলকর্মী, আর্থিক খাতের কর্মী থেকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা—বিভিন্ন পেশার মানুষ ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে পেশাগত ও আইনি ঝুঁকি নিচ্ছেন। ‘ওয়ার্কার্স ফর ফ্রি প্যালেস্টাইন’সহ বিভিন্ন সংগঠন অস্ত্র উৎপাদন, ইসরায়েলে বিনিয়োগ কিংবা যুদ্ধকে সহায়তা করে এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলার আহ্বান জানাচ্ছে।

অন্যদিকে, ব্রিটেনে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্কতাও বাড়ছে। লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ সম্প্রতি একটি বিক্ষোভের ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

ক্লেয়ার ও মারজির মতো আন্দোলনকারীরা মনে করেন—গাজায় যা ঘটছে, সেই বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের নীতির বিরুদ্ধে নাগরিকদের কথা বলা প্রয়োজন। তাঁদের আশঙ্কা, ফিলিস্তিন প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি ব্রিটেনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও সংকুচিত হচ্ছে। তাঁদের ভাষায়, নিষ্ক্রিয় থাকা মানুষের মধ্যে অসহায়ত্ব তৈরি করছে আর সেই কারণেই অনেকে ঝুঁকি নিয়েও প্রতিবাদে যুক্ত হচ্ছেন।