হোম > বিশ্লেষণ

ঝুঁকিতে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা: ক্ষুধা এখন যুদ্ধের হাতিয়ার, যুক্ত হয়েছে সার সংকটও

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: সংগৃহীত

জুলাইয়ের শেষ দিকে রাশিয়া আবারও ইউক্রেনের খাদ্য রপ্তানি অবকাঠামোয় হামলা চালায়। ক্রেমলিন ওদেসা বন্দরে থাকা পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। যার ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ শস্য করিডরের রপ্তানি সক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে যায়। দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ইউক্রেন সরকারও এর জবাবে রাশিয়ার নভোরোসিস্ক বন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং সেখানে দুটি শস্য রপ্তানি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই হামলার মাধ্যমে ইউক্রেন খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাশিয়ার পথ অনুসরণ করে এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতিকে উপেক্ষা করে ইউরোপীয় সমর্থকদের মধ্যে নিজেদের শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করার পথ বেছে নেয়।

খাদ্যকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা একটি প্রমাণিত সামরিক কৌশল। দুনিয়ার বুকে যতদিন ধরে অবরোধ যুদ্ধ কৌশল টিকে আছে, ঠিক ততদিন ধরেই খাদ্যকে অস্ত্রে পরিণত করার কৌশলও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এখন এই কৌশল বৈশ্বিক পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের উভয় দেশের সামরিক অভিযানই দেখিয়ে দিয়েছে—একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধ ক্রমেই সীমাহীন, অসমমিত এবং বিশ্বের খাদ্য আমদানিনির্ভর নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে আরও বেশি আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং হর্ন অব আফ্রিকাজুড়ে কোটি কোটি মানুষের জন্য রাশিয়া ও ইউক্রেনের গম কেবল একটি পণ্য নয়, তাদের খাবারের পাতে রুটি থাকবে কি না, সেটিও তা নির্ধারণ করে দেয়।

খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের এই সমকালীন কৌশলকে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত—যেমন লেনিনগ্রাদ ও হোলোদোমোর অবরোধ—থেকে যে বিষয়টি আলাদা করে, তা হলো এর প্রভাব বিস্তারের পরিসর। খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার এখন আন্তঃদেশীয় বিস্তার ও ভূরাজনৈতিক পরিসর অর্জন করেছে। আধুনিক রাষ্ট্র ও অন্যান্য শক্তিগুলো বৈশ্বিক কৃষিপণ্য এবং সেগুলোকে সহায়তা করা সরবরাহব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানার বহু দূর পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধজুড়ে রাশিয়া এই হাতিয়ার ব্যবহার করে আসছে। আফ্রিকার যেসব সরকারের সমর্থন জাতিসংঘে তাদের প্রয়োজন, তাদের মধ্যে কৌশলগত নির্ভরতা আরও গভীর করতে রাশিয়া গম রপ্তানিকে ব্যবহার করেছে। একই কৌশল ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা দুনিয়া।

কৌশলগত যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে খাদ্য ব্যবহারের প্রবণতা এখন সামরিক সংঘর্ষের একটি ক্রমবর্ধমান বৈশিষ্ট্য। সক্রিয় সংঘাতগুলোতে এটি যুক্ত হচ্ছে এবং মূলত কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনারও একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হচ্ছে। খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে খাদ্য সরবরাহের ইচ্ছাকৃত নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ক্ষতিগ্রস্ত বা বশীভূত করার প্রচেষ্টা পর্যন্ত রয়েছে। বিস্তৃত অর্থে, এটি তিনটি স্বতন্ত্র কিন্তু প্রায়ই পরস্পরের সঙ্গে মিশে থাকা কৌশলের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

১. খাদ্য সহায়তা ও সরবরাহপথের নিয়ন্ত্রণ

এটি এমন এক কৌশল, যেখানে রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় শক্তি আমলাতান্ত্রিক বাধা সৃষ্টি করে, ট্রাক ও স্থাপনা জোরপূর্বক দখল করে, গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ অবরোধ করে এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দিয়ে খাদ্য বিতরণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এর উদাহরণ হিসেবে গাজায় খাদ্য সরবরাহে ইসরায়েলের কথিত বিধিনিষেধ এবং উত্তর ইথিওপিয়ার তাইগ্রে অঞ্চলে সহায়তা আটকে দিতে ইথিওপিয়া সরকার ও ইরিত্রিয়ার সমন্বিত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করা যায়।

২ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা নিজেই একটি অস্ত্র

সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদ্রোহী সংগঠনগুলো বিদ্যমান ক্ষুধাকে কাজে লাগাচ্ছে অথবা কৃত্রিমভাবে খাদ্যের সংকট তৈরি করছে, যাতে এমন ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের দলে টানা যায় যারা নিজেদের পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে অক্ষম। একই সময়ে, খাদ্য সরবরাহের ওপর নিয়ন্ত্রণকে তারা আনুগত্য আদায় ও সদস্যদের ধরে রাখার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করছে। সোমালিয়ায় আল-শাবাবের বাছাই করে খাবার বিতরণ এবং নাইজেরিয়ায় বোকো হারামের কৌশলগত খাদ্য সরবরাহ এর উদাহরণ।

৩. খাদ্য উৎপাদন ও বিতরণ টিকিয়ে রাখা অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা

এর মধ্যে রয়েছে ফসল, গবাদিপশু, কৃষিজমি, সাইলোসহ খাদ্য সংরক্ষণাগার, পানির আধার এবং পুরো সরবরাহব্যবস্থাজুড়ে থাকা পরিবহন করিডর ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করা। রাশিয়া ইউক্রেনের কৃষিপণ্যবাহী বন্দর ও কৃষ্ণসাগরের অবকাঠামোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে এই কৌশল প্রয়োগ করেছে।

দুই দিক থেকেই চাপে খাদ্য উৎপাদনের উপকরণ ও উৎপাদিত পণ্যের প্রবাহ

আগস্টের শুরুতে নয় দিন ধরে ইউক্রেন ৫ লাখ ১০ হাজার টন শস্য রপ্তানি করেছে। রাশিয়া নতুন করে হামলা শুরুর আগে দেশটির কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলো যে গড় গতিতে শস্য রপ্তানি করত, এটি তার মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এই পতনের একটি কারণ রয়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি ভুট্টাবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১০ নাবিক নিহত হওয়ার পরপরই অধিকাংশ শিপিং কোম্পানি ইউক্রেনের বন্দরগুলোতে কার্যক্রম স্থগিত করে। এর ফলে একটি বাস্তব সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিকল্প স্থলপথে প্রতি টনে ৫০ থেকে ৭০ ডলার বেশি খরচ হয়। আর দানিউব নদীতে পানির উচ্চতা কম থাকায় ওই করিডরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা হারিয়েছে।

রাশিয়া যদি খাদ্য অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যেতে থাকে, তাহলে ২০২২ সালের মতো আরেকটি ধাক্কা তৈরি হতে পারে। ওই বছর সংঘাতের কারণে সৃষ্ট সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলকে প্রভাবিত করেছিল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সার ও খাদ্যের দাম উচ্চপর্যায়ে রয়ে গেছে, বিশেষ করে স্থানীয় মুদ্রায় হিসাব করলে। একই সময়ে, ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালির আংশিক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সারের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আর এ বছরের এল নিনো, অর্থাৎ প্রশান্ত মহাসাগরের পর্যায়ক্রমিক উষ্ণায়ন—যা বিশ্বজুড়ে বায়ুমণ্ডলের সঞ্চালন ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে দেয়—প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদনে আরও ক্ষতি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সম্মিলিতভাবে এসব চাপ সরবরাহকে আরও সংকুচিত করছে এবং খাদ্যকে আরও শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত করছে।

জটিল সংকটের যুগে আপনাকে স্বাগতম। জাতীয় নিরাপত্তা মূল্যায়নে এখন একই সঙ্গে একাধিক বিশ্লেষণী ক্ষেত্র বিবেচনা করতে হয়: গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক চোকপয়েন্ট, জলবায়ু ঝুঁকির পূর্বাভাস, পণ্যের দামের অস্থিরতা, সারের ক্রয়ক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রশ্ন।

বর্তমান সংঘাতগুলো আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক খাদ্যব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সম্মিলিত ও পরস্পর-সংযুক্ত প্রভাব তৈরির আশঙ্কা রাখে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এখন যে উৎপাদন ধাক্কা তৈরি হয়েছে, তা উৎপাদনের উপকরণ বা ‘ইনপুট’ পর্যায়ে হরমুজ প্রণালির আংশিক বন্ধ থাকার কারণে চলমান সারসংকটের সঙ্গে মিলিত হবে। এই দুই ধরনের ধাক্কা একই সময়ে উৎপাদনচক্রের দুই প্রান্ত থেকেই বৈশ্বিক শস্য সরবরাহকে প্রভাবিত করছে।

বেশ কয়েকটি সূচক ২০২৭ সালে আরও গুরুতর সংকটের দিকে ইঙ্গিত করছে। সারের উচ্চমূল্যের কারণে পুষ্টি উপাদানের প্রাপ্যতা কমে গেলে উত্তর গোলার্ধে ফসলের ফলন আরও সীমিত হতে পারে। শস্য ও কৃষিপণ্যের দামও একই সঙ্গে বেড়েছে—২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত গমের দাম বেড়েছে ২৪ শতাংশ, চাল ১৪ শতাংশ, সয়াবিন ৮ শতাংশ এবং ভুট্টা ৪ শতাংশ। এপ্রিল মাসে দামের আকস্মিক বৃদ্ধির পর কৃষকরা এরই মধ্যে সারের ক্রয় কমিয়ে দিয়েছিলেন, আর দাম আরও বাড়তে থাকলেও সেই সিদ্ধান্তগুলো তারা পরিবর্তন করেননি।

নাইট্রোজেন ও ফসফেট সরবরাহকারী সারের—অর্থাৎ যে দুটি পুষ্টি উপাদান সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে—সরবরাহ সংকুচিত হওয়ার পর তাদের দামের আচরণ ভিন্ন ছিল। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নাইট্রোজেন সার ইউরিয়ার দাম ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি আংশিক বন্ধ হয়ে গেলে ৮২ শতাংশ বেড়ে যায়। পরে সেই দাম প্রণালি বন্ধ হওয়ার আগের স্তরেরও নিচে নেমে আসে। নাইট্রোজেনের ঘাটতি তাৎক্ষণিকভাবে অনুভূত হয়েছিল। তবে সরবরাহ ফিরে এলে কৃষকরা দেরিতে সার প্রয়োগ করে কিছুটা হলেও ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারেন।

এদিকে, ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি)—একটি যৌগিক সার, যা উদ্ভিদের প্রাথমিক বৃদ্ধি ও শিকড়ের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন ও ফসফেট—এর দাম হঠাৎ লাফিয়ে বাড়ার পরিবর্তে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। জানুয়ারিতে প্রতি টন ৬১৯ ডলার থেকে জুলাইয়ে তা ৭৮১ ডলারে পৌঁছেছে। অবকাঠামোয় দীর্ঘদিনের কম বিনিয়োগের কারণে সরবরাহে কাঠামোগত সংকট তৈরি হওয়ায় ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই দাম উচ্চ পর্যায়েই ছিল। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা। ফসফেটের ঘাটতি মাটির ক্ষতি করতে পারে এবং পরবর্তী মৌসুমগুলোতে ফলনের আশঙ্কাও কমিয়ে দিতে পারে।

কৃষকদের জন্য দামের এই ঊর্ধ্বগতি সরাসরি এসে পড়ছে সার কেনার মৌসুমে। উত্তর গোলার্ধের কৃষকেরা, পাশাপাশি ব্রাজিলের কৃষকেরাও, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে দ্বিতীয় দফার ভুট্টা চাষের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় সয়াবিনের ফসল এখনো মাঠে থাকে এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ভুট্টা রোপণের সময় আসার অনেক আগেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ইউরিয়ার দাম কম এবং ফসফেটের দাম বেশি থাকায় অনেকেই হয়তো ইউরিয়া কিনবেন, কিন্তু ফসফেট কিনবেন না। এর ফলে ভবিষ্যতে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। কারণ, মাটিতে থাকা ফসফেটের মজুত এক মৌসুম সার না দেওয়ার ঘাটতি সামাল দিতে পারে, কিন্তু টানা দুই মৌসুমের ঘাটতি সামাল দিতে পারে না। ২০২৭ সালে সম্ভাব্য খাদ্যসংকটের আরেকটি কারণ হতে পারে এটি।

এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ফসলের দামের তুলনায় নাইট্রোজেনের দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। কিন্তু বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে যতটা স্বস্তিদায়ক, বাস্তবে তা ততটাই বিপরীতমুখী এবং এর আড়ালে আরও গভীর দুর্বলতা রয়েছে। ইউরিয়ার ক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি হলো, এর উৎপাদন অত্যন্ত জ্বালানি-নির্ভর, বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপে মার্চের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে গ্যাসের দাম কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ইউরিয়ার দামও দ্রুত কমেছে। বিপরীতে, ফসফেটের উৎপাদন জ্বালানির দামের প্রতি তেমন প্রভাবিত হয়নি। কারণ এটি ফসফেট শিলা উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর নির্ভরশীল। ফসফেটের সরবরাহে কাঠামোগত ঘাটতি—যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফসফেট শিলার মজুত মরক্কোতে—ব্যাখ্যা করে কেন এর দাম উচ্চ পর্যায়েই থেকে গেছে।

এতে ২০২৬ সালের ধাক্কাগুলোর সবচেয়ে উদ্বেগজনক দীর্ঘমেয়াদি উত্তরাধিকার হিসেবে থেকে যাচ্ছে ফসফেট খাতে কম বিনিয়োগ। এক মৌসুম ফসফেট সার প্রয়োগ না করার ঘাটতি মাটির মজুত দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু দ্বিতীয় মৌসুমে ঘাটতি দেখা দিলে সেই মজুতও কমে যায় এবং তৃতীয় বছরে ফলন কমে যায়। এর অর্থ হলো, এপ্রিলের ধাক্কা এবং অব্যাহত উচ্চ দামের কারণে ২০২৬ সালের চাষাবাদে ফসফেটের ব্যবহার সম্ভবত কমেছে। ২০২৭ সালের চাষের মৌসুমে মাটির মজুত সারের ঘাটতি কিছুটা পূরণ করায় ফলন স্থিতিশীল থাকতে পারে অথবা সামান্য কমতে পারে। ২০২৮ সালের চাষের মৌসুমে মাটিতে ফসফেটের ঘাটতির প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা উল্লেখযোগ্য ফলন ঘাটতি তৈরি করতে পারে।

এরপর রয়েছে শেষ ধাক্কাটি। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ধারণা করছে, ২০২৬ সালের এল নিনো আবহাওয়াগত ঘটনা স্বাভাবিকের তুলনায় তাপমাত্রা বাড়াবে এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটাবে। এই বিশ্লেষণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার অনুমান করছে, ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার আশঙ্কা ৯০ শতাংশ।

কৃষিপণ্য সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের পূর্বাভাস দিতে সহায়তা করে এমন সফটওয়্যার তৈরি করা হেলিওস এআই একটি জলবায়ু বিশ্লেষণ তৈরি করেছে। এতে দেখানো হয়েছে, এসব পরিস্থিতি মিশ্র ধরনের জলবায়ু ঝুঁকি তৈরি করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ চারটি ফসল উৎপাদন অঞ্চলের মধ্যে তিনটির পূর্বাভাস তাদের মৌসুমি স্বাভাবিক মাত্রার নিচে থাকার। এল নিনো পরিস্থিতি এই শীতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে এবং ১৯৫০ সালের পর এটি সবচেয়ে বড় ধরনের এল নিনো ব্যবস্থা হওয়ার আশঙ্কাও বেশি।

আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত হেলিওস এআইয়ের জলবায়ু ঝুঁকি-সংক্রান্ত তথ্য চলতি বছরের ফসল কাটায় বাড়তি ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে এল নিনোর কারণে অস্ট্রেলিয়ার গমের ফলন স্বাভাবিক প্রবণতার তুলনায় ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। ১৯৮০ সালের পর এল নিনো দেখা দেওয়া গত ১৫ বছরের মধ্যে ১০ বছরেই এমন প্রবণতা দেখা গেছে। ভারতে ধানের ফসল এখন প্রজনন পর্যায়ে প্রবেশ করায় আগামী কয়েক সপ্তাহে মোট দিনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সময় অত্যন্ত বেশি বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। এই ঝুঁকি বিশেষভাবে তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশে কেন্দ্রীভূত। ব্রাজিলের সয়াবিনের ফসলও—যা মাত্র চাষচক্রে প্রবেশ করেছে—শুরুতেই পরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের বপন মৌসুমে অধিকাংশ দিনই তাপ ও খরার আশঙ্কা রয়েছে। পরে ফসলের প্রজনন পর্যায়ে অত্যন্ত বেশি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কাও রয়েছে।

বিশ্বের খাদ্যব্যবস্থা রক্ষা করবে কে?

নতুন কোনো সংঘাত না ঘটলেও বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থা চাপের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এখন বিশ্ব নজিরবিহীন জলবায়ুগত প্রভাব, সারের দাম বৃদ্ধির কারণে থেকে যাওয়া সমস্যা এবং মৌসুমি চাহিদার আসন্ন সর্বোচ্চ সময়ের সমন্বিত চাপের মুখোমুখি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউক্রেনের শস্য পরিবহনের ওপর কৃষ্ণসাগরে তীব্রতর হামলার কারণে নতুন করে উৎপাদন ধাক্কা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি সংঘাত। নিঃসন্দেহে এসব বিষয় ২০২৭ ও ২০২৮ সালের ফলনের জন্য পরস্পরকে আরও বাড়িয়ে দেওয়া ঝুঁকি তৈরি করেছে।

শস্য কিংবা সার, উভয় ক্ষেত্রেই সীমিত সরবরাহের জন্য বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং খাদ্যে প্রবেশাধিকারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে ইচ্ছুক ক্ষতিকর ভূরাজনৈতিক শক্তিগুলোর উপস্থিতি বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার দুর্বলতা আরও বাড়াবে। আধুনিক যুদ্ধে খাদ্য সরবরাহ ব্যবহারের এই প্রবণতার বিরুদ্ধে নতুন ধরনের প্রতিরোধব্যবস্থা প্রয়োজন। নীতিনির্ধারক ও সামরিক পরিকল্পনাবিদদের উচিত কৃষি সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতাকে সেই একই জরুরি গুরুত্ব ও কৌশলগত মনোযোগের সঙ্গে দেখা, যা বর্তমানে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বরাদ্দ করা হয়।

নিরাপত্তা পরিকল্পনায় খাদ্যনিরাপত্তাকে পদ্ধতিগত ও কৌশলগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা শুধু একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনৈতিক প্রয়োজনই নয়, এটি একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনুমানের একটি উন্নত কৌশল হিসেবেও কাজ করে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেখিয়েছে, একটি মাত্র গুরুত্বপূর্ণ সংকটপথ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বৈশ্বিক ধাক্কা তৈরি করতে পারে। খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার জন্যও সামরিক ব্যবস্থার মতো একই ধরনের কৌশলগত বিনিয়োগ ও স্থিতিস্থাপকতা পরিকল্পনা প্রয়োজন।

কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন, মানব চলাচল ও বিদ্রোহ, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাণিজ্যযুদ্ধের সংযোগস্থলে খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি বোঝা একবিংশ শতাব্দীতে সামনে আসতে থাকা নতুন ধরনের সংঘাতের একটি নকশা বা রূপরেখা তৈরি করে। সহজভাবে বললে, কৌশলগত পরিকল্পনাবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা যদি খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি বুঝতে পারেন, তাহলে আগামী দশকগুলোতে বহুমাত্রিক সংঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তারা এক ধাপ এগিয়ে থাকবেন।

মার্কিন থিংক ট্যাংক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসে লিখিত মাইকেল ওয়ার্জের নিবন্ধ থেকে অনুদিত