ভারতে নিপাহ ভাইরাস শনাক্তের খবরে করোনা মহামারির ভয়াবহ দিনগুলোর স্মৃতি আবারও ফিরে এসেছে এশিয়ার কয়েকটি দেশের বিমানবন্দরে। পুনরাগমন ঘটেছে মাস্ক, থার্মাল ক্যামেরা এবং যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার মতো সতর্কতামূলক ব্যবস্থার। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এখন পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসে পাঁচজন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য সামনে আসার পর থাইল্যান্ড, নেপাল ও তাইওয়ানসহ কয়েকটি দেশ স্বাস্থ্য নজরদারি ও ভ্রমণ পর্যবেক্ষণ জোরদার করেছে।
বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে—নিপাহ ভাইরাস করোনার মতো দ্রুত ছড়ায় না। তবে এটি একটি ভয়ংকর ভাইরাস। এই ভাইরাস মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি এবং এর উপসর্গ অনেক সময় খাবারে বিষক্রিয়া বা দীর্ঘ ভ্রমণজনিত ক্লান্তির সঙ্গে গুলিয়ে যেতে পারে। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ জন্য আন্তর্জাতিক সতর্কতা ও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তবে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে মানুষের সম্মিলিত সচেতনতা এখনো একরকম নয়। করোনা মহামারির তিন বছরে অনেক শিক্ষা পাওয়া গেছে—উন্নত স্ক্রিনিং ব্যবস্থা, নীতিগত প্রস্তুতি এবং নতুন টিকার দ্রুত উদ্ভাবন ও বিতরণ তার উদাহরণ। কিন্তু সংযুক্ত বিশ্বে সংক্রমণ মোকাবিলার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যকর নয়।
এই প্রেক্ষাপটে বড় ধাক্কা এসেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) জন্যও। সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্থাটি ত্যাগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এক বছর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। সিদ্ধান্তটি প্রায় আট দশকের বৈশ্বিক রোগ প্রতিরোধ কৌশলকে বিপর্যস্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রতিষ্ঠাতা ও অনুদানে বড় অবদান রাখা সদস্যের সরে দাঁড়ানোয় ডব্লিউএইচও-এর সামনে অর্থ ও দক্ষতার বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তবে প্রতিক্রিয়াও এসেছে। গত বছরের মে মাসে জেনেভায় আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে অতিরিক্ত ২১ কোটি ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি সদস্য রাষ্ট্রগুলো বাধ্যতামূলক চাঁদা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, যা বছরে আরও ৯ কোটি ডলার যোগ করবে। একই সময়ে ডব্লিউএইচও প্যানডেমিক চুক্তি গৃহীত হয়—যা করোনার সময়ের মতো সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতা, তথ্য গোপন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ভাঙন এড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) এক সম্পাদকীয়তে আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল মত দিয়েছে—নিপাহ ছাড়াও বিশ্বে আরও নানা রোগ রয়েছে, যেগুলো এখনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ হলেও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের উত্তরাঞ্চলে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মানব মেটাপনিউমোভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েছে। আবার গত আগস্টে চীনের কিছু অঞ্চলে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে হাজারো মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল।
নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে এখন সবাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে। একই সঙ্গে ভ্রমণকারীদেরও সতর্ক থাকতে হবে এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। নিপাহ আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—ভাইরাস, জলবায়ু পরিবর্তনের মতোই, সীমান্ত মানে না। এগুলো মোকাবিলায় তাই বৈশ্বিক ও সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।