যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সালে সৌদি আরবের লোহিতসাগর উপকূলবর্তী ইয়ানবু শহরের কাছে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ চলাকালে এই ঘাঁটিতে তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। কারণ, ইরানের উপকূলের কাছাকাছি মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হামলা শুরু হলে এই নতুন ঘাঁটির গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে এই তথ্য জানিয়েছেন।
সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষা ও সেনা অ্যাটাশে আব্বাস দাহুক বলেন, ইয়ানবুতে ‘লজিস্টিক সাপোর্ট এরিয়া (এলএসএ) জেনকিনসের উদ্দেশ্য হলো ইরানকেন্দ্রিক মার্কিন কৌশলকে সমর্থন করা। যাতে ইরানের উপকূলের একেবারে কাছাকাছি না থেকে এই অঞ্চলে আরও গভীর কৌশলগত অবস্থান তৈরি করা যায়।’
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কার্যকারিতা, যা মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে—চীনা ও রুশ স্যাটেলাইটের সহায়তায় পরিচালিত হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ও স্থায়ী সামরিক ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এ বিষয়ে অবগত বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা এবং বিশ্লেষকেরা এই তথ্য জানিয়েছেন।
সংক্ষেপে বলতে গেলে ইরান যেসব ঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরে যেতে বলছে, যুক্তরাষ্ট্র নিজেও হয়তো ভবিষ্যতে সেসব ঘাঁটিতে আগের মতো ফিরে যেতে চাইবে না।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক পরিচালক এবং মধ্যপ্রাচ্যে সব মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস গত মে মাসে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গকে বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, ইরান এসব ঘাঁটির ওপর কী ধরনের হামলা চালাতে পারে, তা দেখার পর আমরা আর আগের মতো এসব ঘাঁটি দখল করে রাখতে ততটা আগ্রহী নই। আমি যখন সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার ছিলাম, তার তুলনায় এখন পরিস্থিতি অনেক ভিন্ন।’
ডেভিড পেট্রাউস আরও বলেন, ‘আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, বর্তমান সেন্ট্রাল কমান্ডার তাঁর পূর্বসূরিদের মতো কাজ করেননি। আগে সব কমান্ডার তাঁদের বাহিনীর সঙ্গে একই টাইম জোনে অবস্থান করতেন। কিন্তু তিনি সেখানে থাকেননি...তিনি ফ্লোরিডার ট্যাম্পায় অবস্থান করেছেন। সেখান থেকেই পুরো যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে।’
মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো বড়, স্থায়ী এবং সহজে শনাক্তযোগ্য লক্ষ্যবস্তু। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন যুদ্ধের যুগে এসব ঘাঁটির দুর্বলতা আবারও স্পষ্ট হয়ে ওঠে গত সপ্তাহে। বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নাজুক যুদ্ধবিরতি চাপের মুখে পড়ে এবং নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়।
মার্কিন হামলার জবাবে ইরান কুয়েতে হামলা চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করে, ইরান তাদের ঘাঁটিগুলোর দিকে যেসব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল, তার সবই প্রতিহত করা হয়েছে। কিন্তু সোর অ্যাটলাস প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, কুয়েতে আলী আল-সালেম বিমানঘাঁটির একটি আশ্রয়কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে।
এ ছাড়া কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি টার্মিনালও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরানের দাবি, এটি মার্কিন এক প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভুলবশত আঘাত হানার ফল। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ধরে রাখা কার্যত এখন আর টেকসই নয়।
থিংকট্যাংক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ সামরিক বিশেষজ্ঞ মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, ‘এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে, সব স্থায়ী সামরিক ঘাঁটিই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে এবং সম্ভবত পরিবর্তন আসবে। এসব ঘাঁটির পরিধি ছোট করা হলে আমি মোটেও অবাক হব না।’
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে দুই মার্কিন কর্মকর্তা এবং এক বিশ্লেষক বলেন, ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি সম্ভবত এলএসএ জেনকিনসের মতো হবে। অর্থাৎ ইরান থেকে অপেক্ষাকৃত দূরে অবস্থিত ছোট ছোট ঘাঁটি, যেগুলো সহজ লক্ষ্যবস্তু নয়।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি-সংক্রান্ত চুক্তির ধরন একেক দেশে একেক রকম। কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে মার্কিন সেনারা কার্যত স্থায়ীভাবেই মোতায়েন রয়েছে। ওমানে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি রয়েছে, যার আওতায় প্রয়োজন অনুযায়ী আগাম আলোচনা সাপেক্ষে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ চলাকালে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ওমান ছিল সবচেয়ে কম হামলার শিকার হওয়া দেশগুলোর একটি। বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় ২ হাজার ৭০০ জন মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। অথচ দুই দশক আগে সেখানে এর প্রায় দ্বিগুণ মার্কিন সেনা অবস্থান করত।
যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩ সালে কুয়েতভিত্তিক স্থায়ী ঘাঁটিকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে সরে এসে এমন একটি কাঠামো গ্রহণ করে, যার মূল ভিত্তি ছিল প্রবেশাধিকার এবং যৌথ প্রশিক্ষণ। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে পরামর্শ দেওয়া এক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ, যিনি পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘শুনতে শব্দের পার্থক্য মনে হতে পারে, কিন্তু চুক্তির ধরন যুক্তরাষ্ট্র এবং স্বাগতিক দেশের জন্য বাস্তবে গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের কী ভাষায় আতিথ্য দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। আর এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিও আরও নমনীয় হয়ে ওঠে।’
ওই প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে অঞ্চলজুড়ে ওমানের মতো হালকা উপস্থিতি কৌশলের দিকে ঠেলে দেবে, যেখানে স্থায়ী বড় ঘাঁটির বদলে প্রবেশাধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’
যুক্তরাষ্ট্র কি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে আরও সুরক্ষিত করতে পারবে
প্রায় ১৪ হাজার মার্কিন সেনার আবাসস্থল কুয়েতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বড় সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যথা ক্যাম্প আরিফজান এবং আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটি। দুটি ঘাঁটিই ইরানের তীব্র হামলার মুখে পড়েছে।
এর আগে ১৯৯০-এর দশকে সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত আক্রমণের পরই যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতে স্থায়ীভাবে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলে। অটোমান সাম্রাজ্যের আমলে কুয়েত ছিল এমন একটি প্রদেশের অংশ, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল ইরাকের বসরাও। উপসাগরের বাঁক বা প্রান্তে অবস্থিত হওয়ায় কুয়েতের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে ইরান এবং ইরাক-সমর্থিত মিলিশিয়াদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে দেশটি বিশেষভাবে দুর্বল ছিল।
যুদ্ধের পর এসব সামরিক সম্পদ রক্ষার চেষ্টা করার পরিবর্তে, যুক্তরাষ্ট্র সেগুলো সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর মজুদের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মিডল ইস্ট আই প্রকাশ করে, নতুন ইন্টারসেপ্টর চেয়ে আবেদন করলেও উপসাগরীয় দেশগুলোর সেই অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সাড়া দেয়নি। অন্যদিকে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট মে মাসে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তখন মাত্র ২০০টি টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ইন্টারসেপ্টর অবশিষ্ট ছিল।
দাহুক বলেন, ‘এসব ঘাঁটি রক্ষা করতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টর সক্ষমতার ওপর ব্যাপক চাপ পড়ত। যুক্তরাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, ঘাঁটিগুলোকে আরও সুরক্ষিত (হার্ডেন) করে প্রাণহানির ঝুঁকি নেবে, নাকি সেগুলো খালি করবে। আমরা খালি করার পথই বেছে নিয়েছি।’
কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ডগলাস সিলিম্যান বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের ঘাঁটিগুলোর উপস্থিতি আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার জন্য অতিরিক্ত সামরিক প্রতিশ্রুতি ও বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, ‘কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক সামরিক স্থাপনা এই অঞ্চলের অন্য কিছু মার্কিন স্থাপনার মতো এতটা সুরক্ষিত নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র এবং কুয়েত উভয়ই ইরান যুদ্ধের পরও উল্লেখযোগ্য মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে চায়, আর আমার ধারণা উভয় পক্ষই সেটাই চাইবে, তাহলে এসব স্থাপনাকে আরও সুরক্ষিত (হার্ডেন) করতে তাদের বিনিয়োগ করতে হবে।’
যুদ্ধের শুরুর দিকেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে উপসাগরীয় উপকূল থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছিল। মার্চ মাসে, ইরান রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ব্যাপক হামলা চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের তায়েফ বিমানঘাঁটিতে প্রবেশাধিকার পেয়েছিল বলে প্রথম সংবাদ প্রকাশ করে মিডল ইস্ট আই।
আরও পূর্ব দিকে উপসাগরীয় উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক ঘাঁটি। বাহরাইনে রয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর ফিফথ ফ্লিট বা পঞ্চম নৌবহর। কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সদর দপ্তর। আর সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছে আল দাফরা বিমানঘাঁটি। এ ছাড়া মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলো নিয়মিত আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে নোঙর করে। কিন্তু হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের কারণে এই জলপথ মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য কার্যত একটি ‘নো-গো জোন’ বা প্রবেশ-অযোগ্য এলাকায় পরিণত হয়েছে।
সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে দাহুক বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই প্রভাব মার্কিন নৌবাহিনীর রসদ ও সরবরাহ বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, ‘জেবেল আলী হচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলোর জন্য বিদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বন্দরগুলোর একটি।’ মজার বিষয় হলো, দাহুকের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে সৌদি আরবের বর্তমান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, যিনি তখন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে লোহিত সাগরের তীরবর্তী জিজান বন্দরে নৌবাহিনীর জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, সে সময় প্রস্তাবটি গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করা হয়েছিল।
দাহুক আরও বলেন, ‘পারস্য উপসাগর অতিক্রম না করেই যদি জাহাজ ভিড়ানোর জন্য আরেকটি বিকল্প বন্দর পাওয়া যায়, তাহলে জেবেল আলী বন্দরের ওপর নির্ভরশীলতা কমে যাবে।’
মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান