হোম > বিশ্লেষণ

ছররা গুলি: ভারত ও ইসরায়েলে অনুসৃত নৃশংসতার বৈশ্বিক রপ্তানি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ভারতের ‘ককরোচ’দের আন্দোলন দমনে পুলিশ পেলেট গান ব্যবহার করেছিল। ছবি: এএফপি

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া: দ্য সাপ্লাই অব ওয়েপনস অ্যান্ড মিউনিশসন টু ইসরায়েল’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় চলমান ইসরায়েলের ‘গণহত্যামূলক’ সামরিক অভিযানের পুরো সময়জুড়ে ভারত ইসরায়েলে কয়েক লাখ অস্ত্রের যন্ত্রাংশ ও গোলাবারুদের উপাদান পাঠিয়েছে। অ্যামনেস্টি সতর্ক করে বলেছে, এসব রপ্তানি ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে অবদান রাখার ‘যথেষ্ট ঝুঁকি’ তৈরি করছে। সংস্থাটি গাজায় ইসরায়েলের অভিযানকে ‘Ongoing Genocide’ বা ‘চলমান গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

তবে আসল বিপদ কেবল এই প্রাণঘাতী প্রযুক্তিগুলো কীভাবে রপ্তানি ও এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে—তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর চেয়েও বড় বিপদ হলো—বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে এসব অস্ত্র ব্যবহারের ভয়ংকর দৃষ্টান্ত তৈরি হওয়া।

এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো দিল্লিতে পুলিশের পেলেট গান বা ছররা গুলির ব্যবহার। পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা ভারতীয় পার্লামেন্টের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ পেলেট গান ব্যবহার করে। এতে অন্তত ১০ জন বেসামরিক মানুষ আহত হন। আহতদের মধ্যে এক তরুণও রয়েছেন। এই তরুণ হয়তো চিরতরে তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারাতে যাচ্ছেন।

কাশ্মীর থেকে নয়াদিল্লি—জনগণের ক্ষোভ দমনে পেলেট গান ব্যবহারের এই যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যেকোনো যুদ্ধক্ষেত্র সব সময়ই এক ধরনের পরীক্ষাগার। কোনো এক জায়গায় যে বিষয়টিকে বৈধতা দেওয়া হয়, তা কেবল সেখানেই আটকে থাকে না।

ভারত ২০১০ সালে কাশ্মীরে পেলেট গান চালু করে এবং জনবিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের জন্য এটিকে ‘নন-লেথাল’ বা ‘অপ্রাণঘাতী’ কিংবা ‘লেস-লেথাল’ বা ‘কম-প্রাণঘাতী’ অস্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করে। ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এই অস্ত্রের ব্যবহারে ২৪ জন নিহত হন। সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালে সংঘর্ষে সন্ত্রাসবাদী কমান্ডার বুরহান ওয়ানি নিহত হওয়ার পর ব্যাপক বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পেলেট গান ব্যাপকভাবে ব্যবহারের সময়।

ভারতে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধাতব পেলেটের আঘাতে ১৮ জন নিহত হন, ১৩৯ জন দৃষ্টিশক্তি হারান এবং মোট ২ হাজার ৯৪২ জন বিভিন্ন মাত্রায় আহত হন। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৫৯ জনের চোখে গুরুতর আঘাত লাগে। পেলেট গান হলো ‘দশমিক ১২ বোর পাম্প অ্যাকশন শটগান’ (.12-bore pump-action shotgun) যা সাধারণত পাখি শিকারে ব্যবহৃত হয়। এটি এমন এক ধরনের কার্তুজ ছোড়ে, যার মধ্যে কয়েকশ ছোট ধাতব পেলেট থাকে। এগুলো একসঙ্গে একটি মাত্র গুলির মতো সরল পথে না গিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিটি কার্তুজে কয়েকশ পর্যন্ত ছোট পেলেট থাকতে পারে। গুলি ছোড়ার পর এগুলো প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ মিটার প্রতি সেকেন্ড গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিস্তৃত ছড়িয়ে পড়ার কারণে একটি মাত্র গুলিতে একই সময়ে একটি ভিড়ের মধ্যে একাধিক মানুষ আহত হতে পারেন। সংক্ষেপে, এই অস্ত্র দিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য বেছে নিয়ে গুলি চালানো হয় না। নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে যে-ই থাকুক, তার গায়ে পেলেট লাগতে পারে।

কাশ্মীরে পেলেটের কারণে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত, এমনকি নিহতও হয়েছেন। জানালার পাশে বসে থাকা একটি মেয়ে কিংবা মায়ের কোলে থাকা এক শিশুর হতাহত হওয়ার দিকে তাকালেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। এই অস্ত্র তথাকথিত সহিংস বিক্ষোভকারী আর কেবল ভুল সময়ে ভুল জায়গায় থাকা মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেনি।

পুরোনো ক্ষতে খোঁচা

পেলেট গানের নির্মমতা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়, তবে আমরা যদি অন্তত বোঝার চেষ্টা না করি তাহলে কিছুটা হয়তো বোঝা সম্ভব। এর শিকার অধিকাংশ মানুষের জীবন চিরতরে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। ‘কম-প্রাণঘাতী’ বলা হলেও পেলেটগুলো এতটাই ধারালো যে, তা চামড়া ভেদ করে শরীরের ভেতরে আটকে থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এগুলো স্থায়ী ব্যথার কারণ হয়েছে অনেকের। কখনো কখনো এগুলো স্থায়ী অন্ধত্বও ঘটিয়েছে। এই অস্ত্রের কারণে সৃষ্ট মানসিক ক্ষতও অপূরণীয়। এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে আহত হওয়ার পর মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

তারপরও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কাশ্মীরে পেলেট গান ব্যবহারের পক্ষে একটি নির্মিত ‘ব্যাপক ঐকমত্য’ দাঁড় করানো হয়েছিল। আর এই ঐকমত্যে ভিত্তি ছিল সম্পূর্ণ নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। রাষ্ট্র এই অস্ত্রকে গ্রহণ করেছিল এবং একে ‘অপ্রাণঘাতী’ হিসেবে তুলে ধরেছিল। অথচ, বাস্তবে শত শত মানুষ অন্ধ হয়েছে, বহু মানুষ নিহত হয়েছে এবং আরও অনেকে স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এসব তথ্যের নথিভুক্ত প্রমাণ রয়েছে। তবুও দেশজুড়ে তেমন কোনো প্রতিবাদ বা ক্ষোভ দেখা যায়নি।

কাশ্মীরকে ভারতের একটি ‘ব্যতিক্রমী অঞ্চল’ হিসেবে দেখার এই জাতীয় প্রবণতা পেলেট গানের আঘাতের ভুক্তভোগীদের নিয়ে লজ্জাজনক উপহাসকেও উৎসাহিত করেছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ হলো আসন্ন বলিউড চলচ্চিত্র ‘চৌহান।’ সেই নির্মিত বয়ান এই চলচ্চিত্রে ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুক্তি ছিল অত্যন্ত সরল—‘সন্ত্রাসবাদ, জাতীয় নিরাপত্তা।’ অথচ এমন কোনো নথিভুক্ত প্রমাণ নেই যে—এই অস্ত্র কখনো বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। এর ব্যবহার হয়েছে বেসামরিক বিক্ষোভকারীদের ওপর।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা নীতিমালা থেকে ধার করা এক নিরাপত্তা-দর্শন বিদ্রোহ দমনের অজুহাতে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এটি এখন অন্য জায়গায়ও ছড়িয়ে পড়ছে।

সহিংসতার ইতিহাস

দিল্লিতে ব্যবহারের আগে পেলেট গান কৃষকদের আন্দোলন দমনে এবং মণিপুরেও ব্যবহার করা হয়েছিল। দিল্লিতে প্রতিবাদরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে এটি ব্যবহারের ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। তখন বলা হয়েছিল, ‘তারা শিক্ষার্থী, সন্ত্রাসী নয়।’

কিন্তু এই ধরনের অবস্থান কখনোই সেইসব জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না, যাদের জাতীয় কল্পনায় আগে থেকেই সন্ত্রাসীদের সঙ্গে এক করে দেখা হয়েছে—কাশ্মীর, মণিপুর এবং পাঞ্জাব। পাঞ্জাবের কৃষকরাই কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

নির্দোষ ধরে নেওয়ার নীতি সবার জন্য সমান নয়। পরিচয়ের ভিত্তিতে সেটি নির্ধারিত হয়। এর চেয়েও বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, পেলেটের আঘাত নিয়ে প্রশ্নের মুখে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া এখনও পুরোনো কৌশলের ওপর নির্ভর করছে। অস্বীকার থেকে তারা এখন বিষয় ঘুরিয়ে দেওয়ার পর্যায়ে গেছে, কিন্তু জবাবদিহি এখনও নেই।

কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো কে পেলেট গান ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিল এবং কেন দিয়েছিল, তার জবাব দাবি করে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। পরিহাসের বিষয় হলো—কংগ্রেসই ২০১০ সালে পেলেট গান চালু করেছিল। অন্যদিকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে উপস্থিত হয়ে এই বিষয়ে বক্তব্য দিতে বা জবাবদিহি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

জবাবদিহিহীনতা স্বাভাবিকভাবেই পেলেট গান কিংবা ‘অপ্রাণঘাতী’ হিসেবে চিহ্নিত অন্যান্য অস্ত্রের ব্যবহার অব্যাহত থাকার পথ তৈরি করে। কাশ্মীরে ২০১০ সালে কাঁদানে গ্যাসের শেল সরাসরি মানুষের শরীরের ওপরের অংশ লক্ষ্য করে ছোড়ার ঘটনায় তরুণদের নিহত হওয়ার নথিভুক্ত ঘটনাও রয়েছে। এমনকি ভারতের সুপ্রিম কোর্টও পেলেট গান ব্যবহারের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আদালত বিষয়টিকে সরিয়ে নিয়ে গেছে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং প্রচলিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরের (এসওপি) মধ্যে থাকা ফাঁকফোকর পরীক্ষা করার দিকে।

তবে জনবিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে কি না, সেই প্রশ্নকে শুধু এসব বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে বিতর্কটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই বিতর্কে সেইসব অস্ত্রের প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে, যেগুলোকে ‘অপ্রাণঘাতী’ বা ‘কম-প্রাণঘাতী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, কিন্তু বাস্তবে মানুষকে হত্যা করে। এটিও বিবেচনা করতে হবে যে একটি খারাপ দৃষ্টান্ত এক ভূগোল থেকে আরেক ভূগোলে এবং এক দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

প্রাণঘাতী পেলেট গানের বৈশ্বিক রপ্তানি

পেলেট গান ইতোমধ্যেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাজ্যই প্রথম পরিচিত দেশ, যারা হলো উত্তর আয়ারল্যান্ডে ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ভয়াবহ রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত ‘দ্য ট্রাবলস’ দমনের সময় সময় রাবার ও প্লাস্টিকের পেলেট ছোড়া শটগান ব্যবহার করেছিল। উত্তর আয়ারল্যান্ডের এই সহিংস সংঘাত প্রায় ৩০ বছর ধরে চলেছিল। পরে এই অস্ত্রের অনুরূপ সংস্করণ যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশও জনতা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করতে শুরু করে।

পেলেট গানসহ অন্যান্য তথাকথিত ‘অপ্রাণঘাতী’ অস্ত্র ফিলিস্তিনেও প্রায় নির্বিচারে ব্যবহার করা হয়েছে। ভারত এই দমন-পদ্ধতি ইসরায়েলের কাছ থেকে ধার করেছে কি না, তা নিশ্চিত না হলেও, নিজেদের নাগরিকদের লক্ষ্য করতে এখন যে দেশগুলো এই পদ্ধতি ব্যবহার করছে, তাদের তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। ২০১৯ সালে চিলিতে ২৩০ জন মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে পেলেট গান ব্যবহার করে ২২ জন ছাত্র আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয় এবং ৪০০ জনকে অন্ধ করে দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক ইরানের বিক্ষোভেও এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে পেলেটের আঘাতের অন্তত ৭৪টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এক ব্যক্তির ডান বুকের ভেতরের দিকে খুব স্বল্প জায়গায় আটকে থাকা ১৭৪টি পেলেটের আঘাতে তার ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

পেলেট গান আসলে আরেকটি উদাহরণ মাত্র। এটি দেখায়—কোনো রাষ্ট্র একবার এই শিক্ষা পেয়ে গেলে যে বেসামরিক মানুষকে বৈধভাবে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা যায় এবং সেই প্রথম অন্যায় যুক্তির বিরুদ্ধে কেউ প্রশ্ন না তোলে, তখন সেই ধারণাটি কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

পারমাণবিক হামলা হয়তো একটি বিরল ব্যতিক্রম। কিন্তু হোয়াইট ফসফরাস এবং ড্রোন বিমান হামলার মতো যথেষ্ট উদাহরণ রয়েছে, যা একটি নির্মম সত্য প্রকাশ করে—এক জায়গায় যে অস্ত্র বা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তা সেখানেই পড়ে থাকে না। পরবর্তী যে কর্তৃপক্ষ একই ধরনের দায়মুক্তির আড়াল চায়, তার প্রয়োজন অনুযায়ী সেটি অন্য জায়গায়ও পৌঁছে যায়।

মিডল ইস্ট আইয়ে লিখিত ভারতীয় সাংবাদিক অনুরাধা ভাসিনের লেখা থেকে অনূদিত