বাংলাদেশ ও নেপালের পর ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে। এসব আন্দোলনকে বলা হচ্ছে ‘জেন-জি বিক্ষোভ’। ১৩ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণেরা মূলত তাঁদের প্রজন্মকে প্রভাবিত করা বিভিন্ন সংকট ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এসব আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন।
ফ্রান্সে কয়েক সপ্তাহ আগে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে ধুঁকতে থাকা বিদ্যালয়গুলোর দুরবস্থার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। গত সপ্তাহান্তে দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে এসব কর্মসূচিতে পাঁচ থেকে আট লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ‘ককরোচ আন্দোলন’। ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ বাড়ছে দেশটিতে। চলমান আন্দোলনকে মোকাবিলা করতে গিয়ে এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে মোদি সরকার।
এদিকে স্পেনে আবাসনসংকট ও উচ্ছেদের হাত থেকে পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ আইনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে জোর করে উচ্ছেদের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর পার্লামেন্টে বহুল জনপ্রিয় একটি উচ্ছেদবিরোধী আইন পাস না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আগাম নির্বাচনের ডাক দেন। উচ্ছেদের দুই সপ্তাহ পরই মারা যান মারিকারমেন।
আন্দোলন হচ্ছে ইতালি, বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও আলবেনিয়াতেও। ইউরোপের বাইরে এই ধরনের আন্দোলন দেখা গেছে মরক্কো, মাদাগাস্কার ও ইন্দোনেশিয়াতেও। দেশভেদে সংকটের ধরন আলাদা হলেও এসব আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে বৈষম্য। এর একটি দিক শ্রেণিগত হলেও অন্যটি প্রজন্মগত।
২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর ইউরোপে আয় ও সম্পদের বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে একসময় শক্তিশালী বলে পরিচিত ইউরোপীয় কল্যাণরাষ্ট্রের সক্ষমতাও কমেছে। দীর্ঘদিনের ব্যয়সংকোচন নীতির কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ দুর্বল হয়েছে। ফলে যাঁদের অর্থ আছে, তাঁরা উন্নত সেবা কিনতে পারছেন; অন্যদিকে অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
এই পরিস্থিতির প্রভাব তরুণদের ওপর আরও তীব্র। শিক্ষাব্যবস্থায় অর্থের ঘাটতি, পড়াশোনায় দক্ষতা কমে যাওয়া ও মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা তাঁদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন কর্মসূচি পিসার সর্বশেষ ফলাফলও পড়া ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা হ্রাসের চিত্র তুলে ধরেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব ও বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতিকেও এই অবনতির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তারও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রযুক্তি খাতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব ও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের ধীরগতি পরিস্থিতিকে জটিল করছে। বিশেষ করে, কর্মজীবনের শুরুতে তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ পর্যায়ের অনেক কাজ এখন ক্রমেই যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে।
আবাসনসংকটও বড় সমস্যা। আগের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমানে তরুণদের আয়ের অনেক বেশি অংশ ব্যয় হচ্ছে বাড়িভাড়ায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু সংকট। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। বৈষম্যপূর্ণ সমাজে এই সংকট মোকাবিলার দায়ও মূলত ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর বর্তায়।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা ও সরকারি সেবার ক্রমাগত অবনতি তরুণদের মধ্যে বিস্ফোরণমুখী ক্ষোভ তৈরি করেছে। প্যারিস, নয়াদিল্লি, রোম ও মাদ্রিদের রাজপথে সেই ক্ষোভই প্রকাশ পাচ্ছে।
তবে বিক্ষোভের জবাবে বিভিন্ন সরকারের প্রধান পদক্ষেপ হয়ে উঠছে দমন-পীড়ন। বিক্ষোভবিরোধী আইন, গ্রেপ্তার ও পুলিশের বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বিশ্বজুড়েই বাড়ছে। কোথাও এসব পদক্ষেপ আন্দোলন স্তিমিত করছে, আবার কোথাও ক্ষোভ আরও উসকে দিচ্ছে।