বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক বিদ্যুৎ প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় আরও সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা; যা প্রাথমিক অনুমানের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। সময়সীমাও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সাল পর্যন্ত নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যয় বৃদ্ধি ও সময় বাড়ানোর এই প্রস্তাব আজ একনেক সভায় অনুমোদিত হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যয় বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন। ২০১৬ সালে প্রকল্প অনুমোদনের সময় প্রতি ডলারের দাম ধরা হয়েছিল ৮০ টাকা। সেই দর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২২ টাকার বেশি, অর্থাৎ মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৫৩ শতাংশ।
যেহেতু রূপপুর প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থ বিদেশি ঋণনির্ভর এবং বড় অংশের ব্যয় ডলারে পরিশোধযোগ্য, তাই বিনিময় হারের এই পরিবর্তন সরাসরি প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. কবির হোসেনের ভাষায়, ডলারের দর বৃদ্ধিই ব্যয় বৃদ্ধির ‘প্রধান চালক’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্প পরিকল্পনার সময় বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি যথাযথভাবে বিবেচনায় না নেওয়াই এখন বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
রূপপুর বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। ফলে রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, পরামর্শক সেবা, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি অপারেশন ব্যয় প্রাথমিক পর্যায়ে তুলনামূলক কম ধরে নেওয়া হয়েছিল। বাস্তবায়নের পথে এসে দেখা যাচ্ছে, এসব খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে ৩৮টি উপাদানের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে এবং নতুন করে ১০টি উপাদান যুক্ত করা হয়েছে। গ্রিন সিটি আবাসিক এলাকা সম্প্রসারণসহ অতিরিক্ত অবকাঠামো তৈরিও ব্যয় বাড়িয়েছে।
করোনাভাইরাস মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং কিছু রুশ ব্যাংকের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছে। এর ফলে নির্মাণকাজের পাশাপাশি ঋণচুক্তি ও অর্থ ছাড়ের সময়সীমাও একাধিকবার বাড়াতে হয়েছে।
সময় বাড়ার অর্থ শুধু বিলম্ব নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি আর্থিক ব্যয়, সুদ ও প্রশাসনিক খরচ। ফলে প্রকল্পটি ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১-এর নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখনো বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়নি। জ্বালানি লোডিং ও চূড়ান্ত কারিগরি পরীক্ষায় জটিলতা থাকায় সময় গড়াচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে জ্বালানি লোডিং শুরু হলে বছরের মাঝামাঝি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতে পারে। তবে প্রকল্প কর্মকর্তারাই স্বীকার করছেন, পরীক্ষার সময় একাধিক কারিগরি সমস্যা ধরা পড়ায় নির্দিষ্ট সময়সীমা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে রূপপুরের বিদ্যুতের ট্যারিফে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ সেন্টের আশপাশে থাকবে বলে যে হিসাব করা হয়েছিল, বর্তমান বাস্তবতায় তা আর প্রযোজ্য নয়।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান ডলার দর বিবেচনায় নিলে রূপপুরের বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট কমপক্ষে ১০ টাকা হতে পারে। বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ পরিশোধের সময় উৎপাদন ব্যয় আরও বেশি থাকবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য মিজানুর রহমানের মতে, ‘ডলারের দর যদি আরও বাড়ে, তাহলে পারমাণবিক বিদ্যুতের দাম ১০ টাকার অনেক ওপরে চলে যাবে। এতে ভর্তুকির চাপ বাড়বে এবং সামগ্রিক বিদ্যুৎব্যবস্থায় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হবে।’
রূপপুর প্রকল্প ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন, অর্থনৈতিকভাবে কতটা টেকসই হবে এটি। সময়মতো উৎপাদন শুরু না হওয়া, ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বিদ্যুতের দাম অনিশ্চিত থাকায় অনেক বিশেষজ্ঞই প্রকল্পটি ‘হোয়াইট এলিফ্যান্ট’ হয়ে ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। ‘ব্যয়বহুল কিন্তু অপ্রয়োজনীয় বা বোঝা হয়ে ওঠা সম্পত্তি’ বোঝাতে ইংরেজিতে এই বাগধারা ব্যবহার করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রকল্পের স্বচ্ছ ব্যয় মূল্যায়ন, বাস্তবসম্মত ট্যারিফ নির্ধারণ এবং দীর্ঘ মেয়াদে এই বিদ্যুৎ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নীতি সিদ্ধান্ত।