ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ এখন যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রণক্ষেত্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার ও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থনপুষ্ট বাহিনীর এই লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে শহরটির কৌশলগত অবস্থান। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাইজের দক্ষিণে এডেনমুখী প্রধান সড়কটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হুতিদের অগ্রযাত্রায় শহরটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এতে বাস্তুচ্যুতি বাড়ার পাশাপাশি ভয়াবহ মানবিক সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ তাইজ
আনুমানিক ছয় লাখ মানুষের শহর তাইজ দীর্ঘদিন ধরে হুতিবিরোধী প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। ২০১৫ সালের শুরুতে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ তীব্র হওয়ার পর থেকেই শহরটি সংঘাতের সামনের সারিতে রয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকায় হুতিবিরোধী শক্তিগুলোর সর্বশেষ বড় শহরভিত্তিক শক্তিশালী অবস্থান হিসেবে তাইজের গুরুত্ব অপরিসীম।
শহরটি এমন একটি ভৌগোলিক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখান থেকে এডেন এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার দিকে সামরিক তৎপরতা পরিচালনা করা যায়। এডেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল হওয়ায় আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাইজের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে গেলে সরকারপন্থী বাহিনীর জন্য এডেনের প্রতিরক্ষা এবং বাব আল-মান্দেব অঞ্চলে পাল্টা অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে এটি সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের জন্য বড় ধরনের সামরিক ও প্রতীকী পরাজয় হবে।
রণক্ষেত্রে কী ঘটছে
তাইজের উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা আগে থেকেই হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। সরকারপন্থী বাহিনী শহর ও আশপাশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ধরে রেখেছিল। কিন্তু নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হুতিরা দক্ষিণে জাবাল সাবার পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় অগ্রসর হয়ে এডেনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সড়ক বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালায়।
প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুর্গম পাহাড়ি পথটির কয়েকটি অংশ, বিশেষ করে আল-তুরবাহ ও মুদিরিয়াত আল-মিসরাখ এলাকার নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে যাওয়ায় অক্টোবরের শুরু থেকে তাইজ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার সহায়তায় সরকারপন্থী বাহিনী হারানো এলাকা পুনরুদ্ধার ও সড়কটি খুলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত তারা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
কেন হুতিবিরোধী প্রতিরোধের কেন্দ্র তাইজ
উত্তর ইয়েমেনের শাসকদের সঙ্গে তাইজের ঐতিহাসিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েনপূর্ণ। ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময়ও শহরটি সরকারবিরোধী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ওই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতাচ্যুত হন।
হুতিরা জাইদি শিয়া মতাবলম্বী হলেও তাইজের অধিকাংশ বাসিন্দা সুন্নি মুসলমান। তবে বিরোধের কারণ কেবল ধর্মীয় পরিচয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক ক্ষমতা, আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রশ্ন।
২০১৪ সালে সালেহ ও হুতিরা একজোট হয়ে রাজধানী সানা দখল করলে আরব বসন্ত-পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর ব্যাহত হয়। ২০১৫ সালে তাইজে সরকারবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে হুতি ও সালেহপন্থী সেনাদের অভিযান শুরু হলে ব্যাপক বিক্ষোভ ও সশস্ত্র সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ অবরোধে বাসিন্দাদের গোলাবর্ষণ, স্নাইপারের হামলা এবং খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট মোকাবিলা করতে হয়।
মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতে তাইজ প্রদেশে অন্তত ১ লাখ ২১ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এদের অনেকেই শহরের বাইরের গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা।
এডেনের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় শহরে জ্বালানি, খাদ্য, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির সংকট বাড়ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে শহরে গমের আটার মজুত প্রায় নিঃশেষ হওয়ার পথে ছিল। সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বাজারে নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে।
ইয়েমেনে অপুষ্টি, কলেরা, ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি আগে থেকেই প্রকট। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক জরিপে পরীক্ষা করা শিশুদের প্রতি তিনজনে একজনের অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
সরকারপন্থী বাহিনী তাইজের অবরোধ ভাঙতে চেষ্টা চালালেও সাফল্যের নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে হুতিরা অবরোধ আরও শক্তিশালী করে শহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ কিংবা শহর দখলের সরাসরি অভিযান—দুটিরই আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় প্রতিরোধের কারণে সরাসরি দখল অভিযান দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
তাইজের ভবিষ্যৎ তাই কেবল একটি শহরের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে না; এটি ইয়েমেনের যুদ্ধের সামরিক ভারসাম্য, সরকারের টিকে থাকা এবং লাখো মানুষের মানবিক পরিস্থিতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।