হোম > বিশ্লেষণ

চীনা আমদানির বিপজ্জনক ফাঁদে ভারত, উদ্ধারে যে পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। ছবি: সিনহুয়া

ভারতের কোনো খেলনার দোকানে ঢুকে শিশুর পছন্দের নতুন কোনো খেলনা কেনার পাশাপাশি আপনি বুঝতে পারবেন, কীভাবে ভারত তার শক্তিশালী প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে আরও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ছয় বছর আগে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং নিম্নমানের খেলনা দেশের বাজারে প্রবেশ ঠেকানোর লক্ষ্যে ভারত আমদানি করা খেলনার ওপর শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করে। পরে তা আরও বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করা হয়।

এতে খুচরা বিক্রেতারা তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই বিদেশে তৈরি খেলনার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে না। কিন্তু বেশি আমদানি শুল্ক এবং মান নিয়ন্ত্রণের নিয়ম একসঙ্গে কার্যকর করার ফলে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।

২০২০ সালে ভারতের খেলনা আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০ কোটি ডলার। চলতি বছর তা এক-তৃতীয়াংশ কমে ১০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে খেলনা রপ্তানি প্রায় ১২ কোটি ৯০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ২০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি ভারত চীনের ওপর তার নির্ভরতাও নাটকীয়ভাবে কমাতে পেরেছে। একসময় দেশটির স্থানীয় খেলনা বাজারের ৭০ শতাংশ চীনের দখলে ছিল।

ভারতের বৃহৎ প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে ক্রমেই অসম হয়ে ওঠা বাণিজ্য সম্পর্ককে ভারসাম্যে আনার ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির অন্যান্য ব্যর্থ প্রচেষ্টার মধ্যে খেলনা খাতটি একটি বিরল সফল উদাহরণ। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ভারত-চীন বাণিজ্য সম্পর্ক এখন বিশ্বের সবচেয়ে অসম সম্পর্কগুলোর একটি।

২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষের পর ভারত ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এরপর নয়াদিল্লি একের পর এক অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে এবং টিকটকের মতো চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করে। কিন্তু এরপরও বেইজিংয়ের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি কমেনি, বরং ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০২০ সালে এই ঘাটতি ছিল ৪৪ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অবিশ্বাস্য ১১২ বিলিয়ন ডলারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সেন্টার ফর চায়না অ্যানালাইসিসের ফেলো কেভিন জংঝে লি বলেন, ‘রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ সম্পর্ক যখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিল, তখনও চীনের ওপর ভারতের অর্থনৈতিক নির্ভরতা বাড়তেই থেকেছে।’

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সময়ে ভারতের চীনে রপ্তানি মহামারির আগের পর্যায়ের নিচেই রয়ে গেছে, অথচ চীন থেকে আমদানি দ্বিগুণ হয়েছে।

দিল্লিভিত্তিক গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের (জিটিআরআই) অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, ‘চীন এখন ভারতের শিল্পপণ্যের আমদানির ৩০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করে। ১০০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে ভারত চীনের ওপর নির্ভরশীল। আর এই ভারসাম্যহীনতা আরও খারাপ হচ্ছে।’ আমদানির বর্তমান দ্রুত গতি অব্যাহত থাকলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ১৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এতে ভারতীয় শিল্পের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব ও চাপ আরও বাড়বে বলে শ্রীবাস্তব মনে করেন।

সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করার প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং এই ‘কাঠামোগত বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা ও সরবরাহব্যবস্থার সমস্যাগুলো’ সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন।

তবে ভারতের শিল্প অর্থনীতিতে চীনা আমদানি এত গভীরভাবে ঢুকে পড়েছে যে এই কাজ নয়াদিল্লির জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এর প্রধান কারণ হলো, ভারত শুধু চীনের কাছ থেকে তৈরি পণ্য কেনার ওপর নির্ভরশীল নয়। দেশটির শিল্পপণ্য উৎপাদনও ক্রমেই চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

সত্যি বলতে, স্মার্টফোন ও সৌর সরঞ্জামের মতো তৈরি পণ্যের আমদানির ওপর ভারত তার নির্ভরতা কমিয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি আইফোন ভারতে উৎপাদিত হয়। তবে অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, ‘উৎপাদন এখনো মূলত অ্যাসেম্বলিনির্ভর এবং বিশেষ করে চীন থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।’

শিল্প যন্ত্রপাতি, ব্যাটারি তৈরির উপকরণ, রাসায়নিক, সৌরকোষ এবং উৎপাদন সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। ভারতীয় থিংকট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (ওআরএফ) তথ্য অনুযায়ী, শুধু বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক পণ্যই ভারতের মোট আমদানির ৩৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে যন্ত্রপাতি ও যান্ত্রিক সরঞ্জাম, যার অংশ ২১ দশমিক ৭ শতাংশ। জৈব রাসায়নিক ও প্লাস্টিকেরও উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে।

ওআরএফের সেন্টার ফর নিউ ইকোনমিক ডিপ্লোমেসির ফেলো সৌম্য ভৌমিক বলেন, ‘এসব পণ্যের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু ভোক্তাদের ওপর প্রভাব পড়বে না; উৎপাদন ব্যবস্থাই ব্যাহত হবে।’ তাঁর মতে, এর মাধ্যমে বোঝা যায়, চীন থেকে পাওয়া শিল্পের উপকরণ স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করতে ভারত কতটা সমস্যায় পড়ছে।

শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ ও কাঁচামালের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার পাশাপাশি আরও কিছু সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবণতাও ভারতে চীনা আমদানি বাড়াচ্ছে। ইস্পাত থেকে শুরু করে সৌর প্যানেল এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে চীনের বিপুল অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। একই সময়ে দেশটির ধীরগতির অর্থনীতি সেই বিপুল উৎপাদন পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারছে না।

ফলে চীনা নির্মাতারা ক্রমেই বিদেশি বাজারের দিকে ঝুঁকছেন এবং কম দামে পণ্য বিক্রি করছেন। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শ্রীবাস্তব বলেন, এসব পণ্যের একটি বড় অংশ ভারতের বাজারে ঢুকছে। কারণ, ভারত অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে দ্রুত উৎপাদন বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি ‘পশ্চিমা বাজারগুলো শুল্ক ও অন্যান্য বিধিনিষেধ আরোপ করছে।’

অন্যদিকে, চীনা বাজারে প্রবেশের সুযোগ না পাওয়াও ভারতীয় কোম্পানিগুলোর জন্য বড় সমস্যা হয়ে আছে। কেভিন জংঝে লি বলেন, ‘চীনে ভারতীয় পণ্য বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও অশুল্ক বাধার মুখে পড়ে। ফলে সেখানে রপ্তানি বাড়ানো কঠিন হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া যদি পারস্পরিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য বড় কোনো উদ্যোগ ছাড়াই চলতে থাকে, তাহলে ভারত এমন এক পরিস্থিতির ঝুঁকিতে পড়বে যেখানে রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হবে, কিন্তু অর্থনৈতিক নির্ভরতা একই রকম থেকে যাবে।’

অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমানো এবং রপ্তানি বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো ভারতের উৎপাদন খাতকে আরও শক্তিশালী করা বলে মনে করেন শ্রীবাস্তব। তবে এর জন্য খাতভিত্তিক শিল্পনীতি এবং আরও শক্তিশালী মৌলিক অবকাঠামো প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ও ঋণ, দক্ষ সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থা এবং স্থিতিশীল নীতিমালা। এসব ক্ষেত্রেই ভারত এখনো পিছিয়ে রয়েছে।

সম্প্রতি ভারত বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) নিয়মও কিছুটা সহজ করেছে। এর ফলে ভারতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব বিনিয়োগও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন বলে অজয় শ্রীবাস্তব মনে করেন। তিনি বলেন, ‘যে বিনিয়োগ শুধু বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করে অথবা চীনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে পণ্য সংযোজনের কাজ বাড়ায়, তা আমদানি আরও বাড়াতে এবং নির্ভরতা আরও গভীর করতে পারে। তাই অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় মূল্য সংযোজন, দেশে যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং ভারত থেকে রপ্তানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।’

আরও তাৎক্ষণিকভাবে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমাতে ভারত নির্দিষ্ট কিছু খাতে চীনে রপ্তানি বাড়ানোর দিকে নজর দিতে পারে বলে মনে করেন কেভিন জংঝে লি। তাঁর মতে, ওষুধশিল্প এ ক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে। কারণ চীনের জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হচ্ছে এবং দেশটিতে স্বাস্থ্যসেবার খরচও বাড়ছে। তবে লি বলেন, ‘১১২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি শুধু কয়েকটি নির্দিষ্ট বা বিশেষায়িত পণ্য রপ্তানির খাত খুঁজে বের করে কমানো যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘মূল প্রশ্ন হলো, বৃহত্তর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অংশ হিসেবে বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেইজিং ছাড় দিতে প্রস্তুত ও আগ্রহী কি না। অন্যথায় ভারতকে এই আলোচনা বাধ্যতামূলকভাবে সামনে আনার জন্য নিজেদের প্রভাব বা চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা খুঁজে বের করতে হবে।’

বিবিসি থেকে অনূদিত