পশ্চিম গাজা সিটির একটি আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনে বসে ছিলেন ৩৫ বছর বয়সী ফাতিন নাবহান। তাঁকে ঘিরে ছিল তাঁর স্কুলপড়ুয়া ছয় সন্তান। শরণার্থীশিবিরে পানি বহনকারী ট্রাক থেকে সকালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে অবশেষে কিছুটা পানি নিয়ে ফিরেছেন তাঁরা। সেই পরিশ্রমের পর এটি ছিল তাঁদের সামান্য বিশ্রামের মুহূর্ত।
ফাতিন গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময় সন্তানদের ব্যস্ত রাখতে আনন্দদায়ক বা শিক্ষামূলক নানা কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবেন, সেটি যেন বুঝে উঠতে পারেন না। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে গাজায় ইসরায়েলের শুরু করা গণহত্যামূলক যুদ্ধের পর টানা তৃতীয় বছরের মতো ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটির শিশুদের গ্রীষ্মকালীন ছুটি আর আগের মতো নেই।
ইসরায়েলি হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি লোক নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশই শিশু। গাজার অধিকাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং অধিকাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত। এমন পরিস্থিতিতে গাজার ফিলিস্তিনিরা এখন কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত।
একসময় গাজার গ্রীষ্ম মানেই ছিল সামার ক্যাম্প, ভ্রমণ, খেলাধুলা আর আনন্দে ভরা দিন। এখন দিনের শুরুতেই শিশুদের করতে হয় বেঁচে থাকার অপরিহার্য কাজ। তারা পানি সরবরাহকারী ট্রাক ও বিতরণকেন্দ্র থেকে পানি সংগ্রহ করে, লঙ্গরখানা থেকে খাবার আনে, আর আগুন জ্বালানোর জন্য জ্বালানি কাঠ কুড়িয়ে বেড়ায়।
ফাতিন বলেন, ‘আমার সন্তানদের প্রতিদিনের রুটিন এটাই...তারা শুধু এসবই করে।’ তিনি আরও বলেন, গাজার অন্য শিশুদের মতো তাঁর সন্তানদেরও নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ, বিনোদন কিংবা মানসিক স্বস্তি পাওয়ার প্রায় কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘কোনো কার্যক্রম নেই, কোনো ক্যাম্প নেই, ছবি আঁকা নেই, রং নেই, কিছুই নেই। আমি শুধু তাদের কোরআনের কিছু অংশ মুখস্থ করাতে পারি। এর বেশি আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
ফাতিন আরও বলেন, ‘আমাদের অনেক পরিকল্পনা থাকে...গ্রীষ্ম তো শিশুদের শক্তিকে বিকশিত করার এবং তাদের দক্ষতা গড়ে তোলার সময়। কিন্তু প্রয়োজনীয় উপকরণই নেই। কোনো সম্পদ নেই, কোনো সরঞ্জাম নেই...খেলনা নেই, খাতা নেই, রংপেনসিল নেই...এমনকি একটি কাগজ আর একটি কলমও নেই।’
ফাতিনকে একাই ভেবে বের করতে হয় কীভাবে সন্তানদের সময় কাটানো যায়। কারণ, তাঁর স্বামী রাফাত ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে গাজা সিটির কাছে জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরে তাঁদের বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন।
তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানদের খাওয়ানো আর তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই আমি হিমশিম খাই।’ ফাতিন জানান, তাঁর সন্তানদের বয়সের তুলনায় অনেক বড় দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়েছে। তারা পালা করে পানি আনে, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে এবং বাবার অনুপস্থিতিতে মাকে নানাভাবে সাহায্য করে। তিনি বলেন, ‘আমার খুব কষ্ট হয় যে তারা এভাবেই তাদের শৈশব কাটাচ্ছে। এটা তো খেলার সময়, দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার সময় নয়।’
কিন্তু বিকল্পও নেই।
ফাতিন বলেন, স্কুলের গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময় বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবিরগুলোতে শিশুদের মানসিক সহায়তা দেওয়ার জন্য কোনো সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেই। তিনি বলেন, ‘আমাদের শিশুরা পৃথিবীর এক বিস্মৃত কোণে বাস করছে। প্রতিদিন আমি তাদের চোখে হারানোর বেদনা আর দুঃখ দেখতে পাই। এমনকি খেলা, যা তাদের সবচেয়ে সাধারণ প্রয়োজনগুলোর একটি, সেটাও তাদের নেই।’
ফাতিন যে সংকটের কথা বলছেন, সেটি শিশুদের কল্যাণ নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নথিভুক্ত বৃহত্তর সংকটেরই অংশ। মে মাসে প্রকাশিত ইউনিসেফের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, গাজার ছোট শিশুদের জন্য ‘নিরাপদ ও উদ্দীপনামূলক পরিবেশ’, যা তাদের প্রাথমিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য, তার অভাব রয়েছে। অন্যদিকে বড় শিশুরা দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষা ব্যাহত হওয়ার শিকার, লক্ষ্যভিত্তিক হস্তক্ষেপ ছাড়া তাদের শিক্ষার ঘাটতি পূরণের সম্ভাবনা খুবই সীমিত। পাশাপাশি তাদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশের সুযোগও ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
ফেব্রুয়ারি মাসে ফিলিস্তিনে ইউনিসেফের যোগাযোগবিষয়ক প্রধান জোনাথন ক্রিক্স বলেন, গাজার শিশুদের জন্য খেলাধুলা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য। তিনি বলেন, ‘খেলাধুলাই সেই উপায়, যার মাধ্যমে শিশুরা যুদ্ধ তাদের কাছ থেকে যা কেড়ে নিয়েছে, তা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করে।’
আসমা সালেহও তাঁর পাঁচ সন্তানকে নিয়ে গাজায় বাস্তুচ্যুত অবস্থায় বসবাস করছেন। ৪১ বছর বয়সী এই নারী যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি চেষ্টা করে গেছেন তাঁর আট থেকে ১৭ বছর বয়সী সন্তানদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে।
শিক্ষাকে ধরে রাখার সেই দৃঢ় সংকল্পই গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময়সূচি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে। তিনি নিশ্চিত করেন, তাঁর সব সন্তানই কোরআনের আয়াত মুখস্থ করছে। পাশাপাশি স্থানীয় একটি দাতব্য সংস্থার আয়োজিত সামার ক্যাম্পে সপ্তাহে এক দিন করে তাঁর দুই সন্তান অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
তবু সপ্তাহের সেই একটি দিনই শিশুদের জন্য বিশেষ উৎসবের মতো। আশপাশের অন্য শিশুদের তুলনায় তারা নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করে। আসমা হাসিমুখে বলেন, ‘ক্যাম্পের দিন তারা খুব ভোরে উঠে পড়ে, অদ্ভুত রকম উত্তেজনায়। গোসল করতে, চুল ঠিক করতে, পোশাক পরতে ব্যস্ত হয়ে যায়...কখনো কখনো সময়মতো ক্যাম্পে পৌঁছানোর আগ্রহে সকালের নাশতাও খায় না। কিন্তু সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে সেই উৎসাহ আর দেখা যায় না। দিনগুলো একঘেয়েমির মধ্যেই কেটে যায়।’
বাকি ছয় দিন একই রুটিন। ঘুম থেকে ওঠা, খাবার খাওয়া এবং তাঁবুর ভেতরে মাকে প্রতিদিনের কাজে সাহায্য করা। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে কাপড় ধোয়া, রান্না করা, ময়দা মাখা এবং পানি সংগ্রহ করা।
আসমা আগে ইউনিসেফে কেস ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। তিনি বলেন, তাঁর সন্তানদের জন্য সপ্তাহে এক দিনের সামার ক্যাম্প কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়। তিনি বলেন, ‘ছুটির সময় সংগঠিত দলগত কার্যক্রম শিশুদের বুদ্ধিবিকাশ, আবেগগত বিকাশ, সহযোগিতার মনোভাব এবং পারস্পরিক বন্ধন গড়ে তোলে। অন্যদিকে দিনের পর দিন তাঁবুর মধ্যে কোনো ইতিবাচক সুযোগ ছাড়া আটকে থাকলে মানসিক চাপ জমতে থাকে, যা কখনো কখনো ভাইবোনদের মধ্যে ঝগড়া ও আক্রমণাত্মক আচরণে রূপ নেয়।’
নিজের পরিবারের একটি উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর তৃতীয় মেয়ে, যে তার দুই বোনের মতো সামার ক্যাম্পে যেতে পারে না। আসমা বলেন, ছোট মেয়েটির মধ্যে প্রায়ই মানসিক চাপের লক্ষণ এবং ভাইবোনদের সঙ্গে সংঘাত দেখা যায়। অন্যদিকে বড় মেয়েরা, বিশেষ করে ক্যাম্প থেকে ফিরে আসার পর, ‘একেবারে সতেজ ও আনন্দিত’ থাকে।
একজন মা হিসেবে এটি তাঁর কাছে খেলাধুলা ও শিক্ষার গুরুত্বের আরেকটি প্রমাণ। কারণ, খেলাধুলা ও শিক্ষা আন্তর্জাতিক সনদে স্বীকৃত শিশুদের অন্যতম মৌলিক অধিকার। আসমা বলেন, ‘আজ গাজার শিশুরা ঠিক সেই অধিকারগুলো থেকেই বঞ্চিত, যে সময় তাদের সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে সেগুলো ভোগ করার কথা।’
এখন তিনি চেষ্টা করছেন, সামার ক্যাম্পে যেতে না পারা সন্তানদের জন্যও কিছু না কিছু কার্যক্রমের ব্যবস্থা করতে। সম্প্রতি একটি দাতব্য সংস্থা তাঁকে রংপেনসিল ও কিছু আঁকার কাগজ দিয়েছে। এখন তিনি প্রতিদিন দিনের একটি সময় সন্তানদের সঙ্গে বসে ছবি আঁকেন এবং রং করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার সন্তানদের গ্রীষ্মকালীন সময়টাকে কোনো না কোনোভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। আর আমি থেমে যাই না। কারণ, আমি নিজের চোখেই দেখতে পাই, তাদের সঙ্গে মাত্র এক ঘণ্টা পরিকল্পিতভাবে খেলাধুলা ও ছবি আঁকার পর তাদের মানসিক অবস্থায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।’