যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানের বর্তমান রেজিম বা শাসনব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্যে হামলা চালিয়েছেন। তাঁর এই পরিকল্পনা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসনের হস্তক্ষেপ নীতি থেকে একটি তীক্ষ্ণ বিচ্যুতিকে চিহ্নিত করছে। সোজা কথায়, তাঁর নীতি অতীতের যেকোনো মার্কিন প্রশাসনের রেজিম চেঞ্জ নীতির চেয়ে আলাদা।
ইতিহাসবিদরা অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের ইরানের ওপর হামলা এবং সরাসরি দেশটির জনগণকে বিদ্রোহের আহ্বান—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক ও ভেনেজুয়েলার প্রতি দমন নীতির তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই জুয়া তাঁর বিদেশ নীতি আরও অনিশ্চিত এবং অপ্রত্যাশিত হতে পারে, যেহেতু তিনি অন্যান্য স্থানে শক্তির ব্যবহার খোলাখুলি হুমকি দিচ্ছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শনিবার ঘোষণা করেছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন। এর ফলে, দেশটির সরকারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ট্রাম্প শনিবার ইরানের ওপর সামরিক হামলার ঘোষণা দেন এবং অস্পষ্টভাবে ইরানি জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান।
হামলাগুলো ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে ব্যর্থ কূটনীতির ফলাফল। অবশ্য, এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। কারণ, ইরানের ন্যায্য দাবির মুখে ট্রাম্পের অনড় অবস্থান হোয়াইট হাউসে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণ।
অভিযান ঘোষণার পর ট্রাম্প একটি ভিডিও বার্তায় ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, ‘যখন আমরা (হামলা) শেষ করব, তারপর আপনারা আপনার সরকার দখল করুন। এটি হবে হয়তো আপনার প্রজন্মের একমাত্র সুযোগ।’ ট্রাম্প অ্যাক্সিওসকে একান্তে বলেছেন, তিনি যে ‘অফ র্যাম্প’ বা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ দেখতে পান তা হলো—‘আমি চাইলে দীর্ঘ সময় নিতে পারি এবং সবকিছুই দখল করতে পারি, অথবা দুই-তিন দিনের মধ্যে শেষ করে ইরানিদের বলব, “কয়েক বছরের মধ্যে আবার দেখা হবে যদি আপনি আপনার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রোগ্রাম পুনঃ নির্মাণ শুরু করেন”।’
ট্রাম্পের ইরান নীতি ২০০৩ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের সময় ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন এবং জানুয়ারি মাসে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোর অধিকার দখলের মতো পরিস্থিতির থেকে আলাদা। সেই দুই উদাহরণে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সরকারের ক্ষমতা কাঠামো ধ্বংসে নিয়োজিত ছিল।
ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির সামরিক ইতিহাসের অধ্যাপক অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা কর্নেল পিটার মানসুর অ্যাক্সিওসকে জানান, ‘ইরান উভয় সংঘাতের থেকে আলাদা।’ ইতিহাসবিদদের মতে, উভয় রেজিম পতন পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের সরকারি কাঠামো বিবেচনা করা হয়েছিল—যা ইরান সংকটে এখনো স্পষ্ট নয়। মানসুর বলেন, ‘২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস বলেছিলেন, আমাকে বলো—এটি কীভাবে শেষ হবে।’
ইরাক যুদ্ধের সঙ্গে পার্থক্য
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ যখন ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের শাসন উৎখাতের চেষ্টা করেছিলেন, তখন মার্চ ২০০৩-এ ২ লাখ মার্কিন সেনা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরু করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাগদাদের পতন হয়, এবং ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে, অভিযানের ৯ মাসের কম সময়ের মধ্যে বন্দী হন সাদ্দাম হোসেন। ইরাকের বিরুদ্ধে মার্কিন জোটের লক্ষ্য নির্দিষ্ট ছিল—সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ এবং সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক অস্ত্র ধ্বংস করা। যদিও কোনো কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায়নি ইরাকে। অথচ, এই অজুহাতেই হামলা করা হয়েছিল দেশটিতে।
বাগদাদ দখলের পর যুক্তরাষ্ট্র একটি অস্থায়ী সরকার পরিচালনা করে, যা যুদ্ধের পর বহু বছরের পর চূড়ান্তভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে ইরাকের সম্পূর্ণ সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করেছিল। কলম্বাস স্টেট ইউনিভার্সিটির সামরিক ইতিহাসের অধ্যাপক ডেভিড কিয়েরান বলেন, ‘ইরাক যুদ্ধ একটি উদাহরণ, যেখানে অন্য দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দ্রুত ও সহজভাবে পরিবর্তন করার ধারণা কতটা ভুল হতে পারে, তা দেখা গেছে।’
অন্যদিকে, ট্রাম্প ইরান বিষয়ে সরাসরি সরকার নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দেননি, কিংবা সেনা প্রেরণের কোনো ইঙ্গিত দেননি। বরং তিনি ইরানিদের নিজেদের হাতে সরকার পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে পার্থক্য
ট্রাম্প জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার শাসন উৎখাতের সিদ্ধান্ত নেন, যেখানে কিছু সেনা কার্যক্রমও ছিল। গোপনে, হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা মাদুরো অপসারণকে মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখেছিলেন। কিয়েরান বলেন, ‘তারা বিশেষ বাহিনী অভিযান দিয়ে মাদুরোকে সরিয়েছে, কিন্তু মূলত ভেনেজুয়েলার সরকার অক্ষত রেখেছে।’
ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতার স্থানান্তর এবং ভবিষ্যতের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবে—যা কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় কাঁচামালের নিয়ন্ত্রণও নিয়েছে, যেখানে বিশ্বের বৃহত্তম কাঁচামাল সংরক্ষণ রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতি এখান থেকে আলাদা—ট্রাম্প ইরানের সরকার দখল বা আগ্রাসনের কোনো ইঙ্গিত দেননি।
ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা অভিযান থেকে পরপর কিউবার বিরুদ্ধে পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, কিউবার শাসন ব্যবস্থা শেষ করতে চান। কিন্তু তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো কোনো পদক্ষেপ নেবে না, কারণ দেশটি নিজের স্বার্থেই পতিত হতে পারে। তিনি বলেন, ‘কিউবা মনে হচ্ছে পতনের প্রস্তুত, আমি মনে করি কোনো পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই।’
ইরানের ভবিষ্যৎ
সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে ইরানের উত্তরাধিকার পরিকল্পনা এখনো অস্পষ্ট। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, একজন নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের জন্য একজন আলেম কাউন্সিলকে মনোনয়ন করতে হবে। তবে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডারদের মধ্যে সাধারণ শৃঙ্খলা অচল এবং বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। ইরানের মিত্র চীন এই হামলার প্রতি ‘ব্যাপকভাবে উদ্বিগ্ন।’ প্রতিবেদন বলছে, রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে ‘পূর্বনির্ধারিত ও অপ্রয়োজনীয় সশস্ত্র আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
বিগত ৩০ বছর ধরে ইরান বিষয়ে অধ্যয়ন করা ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো সুজান মালোনি বলেছেন, ইরানের বিক্ষোভকারীরা এখনো সরকারের বিরুদ্ধে কোনো বড় আক্রমণ চালানোর লক্ষণ দেখাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আজকে যদি (ইরানের বর্তমান রেজিমের নেতাদের মধ্যে) বড় ধরনের পলায়ন বা অন্য কোনো পরিস্থিতি না দেখা যায়, তাহলে বিদ্রোহ সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।’
এপির প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানে মার্কিন–ইসরায়েলি হামলায় আজ রোববার দুপুর পর্যন্ত অন্তত ২০০ জন নিহত এবং ৭০০-এর বেশি আহত হয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ইসরায়েলি হামলায় একটি কন্যা বিদ্যালয় লক্ষ্য করা হয়েছে, যেখানে ৫৩ শিক্ষার্থী নিহত এবং ৬৩ আহত হয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘ইরান তাদের শাস্তি দেবে যারা আমাদের শিশুদের হত্যা করেছে।’ তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কারণ বুঝতে পারছি না। সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এতে জড়িত হয়েছে।’
কিয়েরান বলেন, ‘এখন স্পষ্ট নয় এই শাসন ব্যবস্থা পতিত হবে কি না, অথবা এই হামলার ফলে শাসন ব্যবস্থা নিজে পদত্যাগ করবে কি না। এবং মূল প্রশ্ন হলো, এটি কোনোভাবে প্রতিস্থাপিত হবে।’
অ্যাক্সিওস থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান