২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইসরায়েল, আর্মেনিয়া, হাঙ্গেরি, থাইল্যান্ড, নেপাল, বাংলাদেশসহ একাধিক দেশের জাতীয় নির্বাচন। এসব দেশের নির্বাচন নিয়ে ‘ইলেকশন টু ওয়াচ ইন ২০২৬’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে মার্কিন ম্যাগাজিন ফরেন পলিসি।
ওই নিবন্ধে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে বলা হয়েছে, অধিকাংশ দেশের নির্বাচনই মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশ ও নেপালে তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের শাসকদের পতনের পর প্রথমবারের মতো ভোট হতে যাচ্ছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে এবারের নির্বাচনে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রতিযোগিতা হবে। ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের কয়েক মাস পরই জেন-জি অর্থাৎ তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন এক গণ-অভ্যুত্থানে দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসক শেখ হাসিনার পতনের পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু নতুন সরকারই বেছে নেবে না, বরং ‘জুলাই সনদ’ নামক একটি সাংবিধানিক সংস্কারের ওপরও রায় দেবেন দেশটির জনগণ।
এবারের নির্বাচন গত দেড় দশকের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় আলাদা হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। গত আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে বর্তমানে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাংলাদেশের একটি আদালত তাঁকে (শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে) মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে।
গত আগস্ট থেকে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না এবং নির্বাচনের পরেই তাঁর কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাবেন।
নির্বাচনের দিনেই একটি ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ নির্ধারণ (দুই মেয়াদের বেশি নয়), দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো মৌলিক সংস্কারের বিষয়ে জনগণ ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন।
শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর ঠিক কয়েক দিন আগে তাঁর এই ফেরা বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। নির্বাচনের পর বিএনপির তারেক রহমানই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে সর্বাগ্রে।
দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এখন একে অপরের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, দল দুটি জনসমর্থনের দৌড়ে প্রায় সমানে সমান অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে জুলাই অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) এবারের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারা ইতিমধ্যে জামায়াতের সঙ্গে একটি নির্বাচনী জোট গঠন করেছে।
ড. ইউনূসের সরকারকে বর্তমানে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে; বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত উচ্চ শুল্ক বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়াকে ভারত অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে।
এদিকে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এই নির্বাচন বর্জন এবং প্রতিহত করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আওয়ামী লীগকে ছাড়া নির্বাচন হলে দেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে একজন ছাত্রনেতা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রাজধানী ঢাকায় নাশকতা ও অস্থিরতা দেশটির নির্বাচনী পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে।