নতুন বছরে মাত্র এক সপ্তাহ পার হয়েছে। এর মধ্যেই পাকিস্তানের বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধু ও তাঁর বাংলাদেশি সমকক্ষ এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের বৈঠকের পর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঘোষণা দিয়েছে, পাকিস্তানে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি শিগগিরই চূড়ান্ত হতে পারে।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ আইএসপিআর এক বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান পাকিস্তান বিমানবাহিনীর (পিএএফ) যুদ্ধ দক্ষতার প্রশংসা করেছেন এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ‘পুরোনো বহর আধুনিকীকরণ ও আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থার সংযুক্তি জোরদার করে আকাশ নজরদারি বাড়াতে’ সহায়তা চেয়েছেন।
গত ৬ জানুয়ারি প্রকাশিত বিবৃতিতে সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান দ্রুত সরবরাহের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বলা হয়, ‘জেএফ-১৭ থান্ডার বিমান সম্ভাব্য ক্রয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।’ সুপার মুশাক হালকা, দুই থেকে তিন আসনবিশিষ্ট এক ইঞ্জিনের বিমান। এই বিমানটির স্থির (নন-রিট্র্যাক্টেবল) ট্রাইসাইকেল ল্যান্ডিং গিয়ার আছে। এটি মূলত প্রশিক্ষণ কাজে ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তান ছাড়াও বর্তমানে আজারবাইজান, তুরস্ক, ইরান, ইরাকসহ ১০ টির বেশি দেশ পাইলট প্রশিক্ষণের জন্য এই বিমান ব্যবহার করছে।
এর ঠিক এক দিন পরই বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, পাকিস্তান ও সৌদি আরব প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের সৌদি ঋণকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান চুক্তিতে রূপান্তর করার বিষয়ে আলোচনা করছে। এতে দীর্ঘদিনের মিত্র দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদার হতে পারে। এই আলোচনা হলো গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির মাত্র কয়েক মাস পর।
এই দুই ঘটনার আগে, গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে খবর আসে—পাকিস্তান লিবিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (এলএনএ) সঙ্গে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে পৌঁছেছে। এর আওতায় এক ডজনের বেশি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়টিও রয়েছে।
যদিও পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এখনো লিবিয়া বা সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো চুক্তির আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা দেয়নি এবং বাংলাদেশও এখন পর্যন্ত কেবল ‘আগ্রহ’ প্রকাশ করেছে, কোনো চুক্তি সই করেনি—তবু বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের ঘটনাপ্রবাহ জেএফ-১৭–এর আকর্ষণ বাড়িয়েছে।
তবে তুলনামূলকভাবে কম দাম—প্রতি ইউনিট আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার—হওয়ায় গত ১০ বছরে বেশ কয়েকটি দেশ এই বিমানে আগ্রহ দেখিয়েছে। নাইজেরিয়া, মিয়ানমার ও আজারবাইজান ইতিমধ্যে তাদের বহরে এই জেট যুক্ত করেছে। আর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পাকিস্তানের আকাশযুদ্ধ সক্ষমতার সুনাম আরও বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনব্যাপী তীব্র আকাশযুদ্ধ হয়। উভয় পক্ষই একে অপরের ভূখণ্ডে সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। পাকিস্তান দাবি করে, আকাশযুদ্ধে তারা একাধিক ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রথমে এই দাবি অস্বীকার করলেও পরে কিছু বিমান হারানোর কথা স্বীকার করেন, যদিও কতটি বিমান ভূপাতিত হয়েছে তা স্পষ্ট করেননি।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক এয়ার কমোডর আদিল সুলতান বলেন, ‘পিএএফ অনেক বেশি দামি পশ্চিমা ও রুশ প্রযুক্তির বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছে, যা এই বিমানগুলোকে অনেক দেশের বিমানবাহিনীর কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।’ ভারতীয় বিমানবাহিনী (আইএএফ) ঐতিহ্যগতভাবে ফরাসি মিরেজ-২০০০ ও রুশ সু-৩০ জেটের ওপর নির্ভরশীল। তবে ২০২৫ সালের সংঘাতে তারা ফরাসি রাফাল জেটও ব্যবহার করে।
অন্যদিকে পাকিস্তান নির্ভর করে সদ্য আমদানি করা চীনা জে-১০সি ‘ভিগোরাস ড্রাগন’, জেএফ-১৭ থান্ডার এবং যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন জেটের ওপর। পিএএফের তথ্যমতে, ৪২টি পাকিস্তানি বিমান ৭২টি আইএএফ বিমানের মোকাবিলা করে।
জেএফ-১৭ থান্ডার কী
জেএফ-১৭ থান্ডার একটি হালকা ওজনের, সব ধরনের আবহাওয়ায় ব্যবহারের উপযোগী, বহু ভূমিকার যুদ্ধবিমান। এটি যৌথভাবে তৈরি করেছে পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স (পিএসি) এবং চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট করপোরেশন (সিএসি)। পাকিস্তান ও চীন ১৯৯০–এর দশকের শেষ দিকে এই বিমান উন্নয়নের চুক্তি করে। ২০০০–এর দশকের শুরুতে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে অবস্থিত কামরায় পিএসিতে কাজ শুরু হয়।
এই প্রকল্পে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা পাকিস্তান বিমানবাহিনীর এক অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর জানান, উৎপাদনের ৫৮ শতাংশ হয় পাকিস্তানে এবং ৪২ শতাংশ চীনে। তিনি বলেন, ‘আমরা সামনের ফিউজিলাজ ও ভার্টিক্যাল টেইল তৈরি করি, আর চীন মাঝের ও পেছনের ফিউজিলাজ বানায়। এতে রুশ ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয় এবং ব্রিটিশ নির্মাতা মার্টিন বেকারের সিট বসানো হয়। তবে বিমানের সম্পূর্ণ সংযোজন পাকিস্তানেই করা হয়।’ প্রকল্পে জড়িত থাকার কারণে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন।
তিনি জানান, ২০০৭ সালের মার্চে প্রথমবার জনসমক্ষে বিমানটি উন্মোচন করা হয় এবং ২০০৯ সালে প্রথম সংস্করণ ব্লক-১ অন্তর্ভুক্ত হয়। সবচেয়ে উন্নত ব্লক-৩ সংস্করণ ২০২০ সালে পরিষেবায় আসে। তিনি বলেন, ‘মূল ধারণা ছিল পাকিস্তানের পুরোনো বহর প্রতিস্থাপন করা। পরবর্তী এক দশকে এই বিমানগুলোই আমাদের বিমানবাহিনীর মূল শক্তি হয়ে ওঠে, যেখানে ১৫০ টির বেশি যুদ্ধবিমান রয়েছে।’
জেএফ-১৭–এর আগে পাকিস্তান মূলত ফরাসি দাসোঁ নির্মিত মিরেজ-৩ ও মিরাজ-৫ এবং চীনা জে-৭ যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভর করত। ব্লক-৩ সংস্করণের জেএফ-১৭–কে ৪ দশমিক ৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের কাতারে নিয়ে গেছে। এতে আকাশ-থেকে-আকাশ ও আকাশ-থেকে-ভূমিতে আক্রমণের সক্ষমতা, উন্নত অ্যাভিওনিক্স, অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (এইএসএ) রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থা এবং দৃষ্টিসীমার বাইরের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ক্ষমতা রয়েছে।
এই অ্যাভিওনিক্স ও ইলেকট্রনিক সক্ষমতা চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান—যেমন এফ-১৬ বা সু-২৭—থেকে উন্নত, যেগুলো মূলত গতি ও ডগফাইটের জন্য তৈরি ছিল। এইএসএ রাডার একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্য শনাক্ত করতে পারে এবং দূরপাল্লায় বেশি দৃশ্যমানতা দেয়। তবে পঞ্চম প্রজন্মের বিমানের মতো এগুলোর স্টেলথ সক্ষমতা নেই। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর মতে, এই জেট মাঝারি ও নিম্ন উচ্চতায় উচ্চ গতিশীলতা দেয় এবং আগুনশক্তি, চপলতা ও টিকে থাকার ক্ষমতার সমন্বয়ে ‘যেকোনো বিমানবাহিনীর জন্য শক্তিশালী একটি প্ল্যাটফর্ম।’
কে এবং কারা জেএফ-১৭ কিনেছে
প্রথম দেশ হিসেবে মিয়ানমার ২০১৫ সালে অন্তত ১৬টি ব্লক-২ জেএফ-১৭ অর্ডার করে। এর মধ্যে সাতটি ইতিমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে। নাইজেরিয়া দ্বিতীয় ক্রেতা হিসেবে ২০২১ সালে তিনটি জেএফ-১৭ নিজেদের বিমানবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আজারবাইজান ১৬টি জেটের প্রাথমিক অর্ডার দেয়, যার মূল্য দেড় বিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আজারবাইজান তাদের বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে পাঁচটি জেএফ-১৭ প্রদর্শন করে, ফলে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে তৃতীয় বিদেশি ব্যবহারকারী হয়।
একই মাসে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী জানায়, তারা একটি ‘বন্ধু দেশের’ সঙ্গে জেএফ-১৭ ক্রয়ের জন্য একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। তবে ক্রেতার নাম প্রকাশ করা হয়নি। ইরাক, শ্রীলঙ্কা ও সৌদি আরবসহ আরও কয়েকটি দেশ গত এক দশকে জেএফ-১৭ কেনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেছিল, তবে সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও ইরাক এই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।
যদিও পিএএফের যুদ্ধবহরের বড় অংশ জেএফ-১৭ দিয়ে গঠিত, চীনা বিমানবাহিনী এই বিমান ব্যবহার করে না। তারা বেশি নির্ভরশীল জে-১০, জে-২০ এবং উন্নয়নাধীন জে-৩৫ যুদ্ধবিমানের ওপর। নিজ দেশেই সম্পূর্ণ সংযোজন হওয়ায় জেএফ-১৭–এর প্রধান বিক্রেতা পাকিস্তানই, যার মধ্যে বিক্রয়োত্তর সেবাও অন্তর্ভুক্ত।
অন্য যুদ্ধবিমানের তুলনায় জেএফ-১৭ কেমন
বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমান হলো পঞ্চম প্রজন্মের জেট—যুক্তরাষ্ট্রের এফ-২২ ও এফ-৩৫, চীনের জে-২০ ও জে-৩৫ এবং রাশিয়ার সু-৫৭। এসব বিমানে স্টেলথ প্রযুক্তি রয়েছে, যা আগের প্রজন্মে ছিল না। বিপরীতে, জেএফ-১৭–এর ব্লক-৩ সংস্করণ ৪ দশমিক ৫ প্রজন্মের, যেমনটা সুইডেনের গ্রিপেন, ফ্রান্সের রাফালে, ইউরোফাইটার টাইফুন, ভারতের তেজস এবং চীনের জে-১০।
স্টেলথ না থাকলেও, ৪ দশমিক ৫ প্রজন্মের বিমানগুলোতে বিশেষ আবরণ থাকে, যা রাডারে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কমায়। উদাহরণ হিসেবে, একটি এই প্রজন্মের জেট শত্রুর রাডার এলাকায় ঢুকলে শনাক্ত হতে পারে, তবে একই সঙ্গে ইলেকট্রনিক জ্যামিং করে সংকেত বিঘ্নিত করতে পারে বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে আঘাত হেনে ফিরে আসতে পারে। অন্যদিকে, পঞ্চম প্রজন্মের বিমান তাদের নকশা ও অভ্যন্তরীণ অস্ত্রবহন ব্যবস্থার কারণে রাডারে একেবারেই ধরা পড়ে না।
সরকারিভাবে দাম প্রকাশ না করা হলেও, জেএফ-১৭–এর দাম প্রতি ইউনিট ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হয়। তুলনায় একটি রাফালের দাম ৯০ মিলিয়ন ডলারের বেশি এবং গ্রিপেনের দাম ১০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ইসলামাবাদভিত্তিক এক আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, জেএফ-১৭–এর মূল আকর্ষণ হলো এর কম খরচ, কম রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে প্রমাণিত সক্ষমতা।
তিনি বলেন, ‘জেএফ-১৭–এর আকর্ষণ শুধু শীর্ষ পারফরম্যান্সে নয়, বরং পুরো প্যাকেজে—যার মধ্যে কম দাম, নমনীয় অস্ত্র সংযোজন, প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ এবং পশ্চিমা দেশের রাজনৈতিক শর্ত কম থাকা অন্তর্ভুক্ত।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই অর্থে জেএফ-১৭ যথেষ্ট ভালো মাল্টিরোল জেট, যা সীমিত বাজেটে আধুনিকায়ন করতে চাওয়া বিমানবাহিনীর জন্য উপযোগী। তবে এটি জে-১০সি বা এফ-১৬ ভি–এর মতো উচ্চমানের বিমানের সরাসরি বিকল্প নয়—বিশেষ করে পাল্লা, অস্ত্র বহনক্ষমতা, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার পরিপক্বতা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভাবনার ক্ষেত্রে।’
এয়ার ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি অব অ্যারোস্পেস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ডিন আদিল সুলতান বলেন, ২০২৫ সালে ভারতীয় বিমানের বিরুদ্ধে জেএফ-১৭–এর পারফরম্যান্স এর সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আকাশযুদ্ধের ফলাফল শুধু বিমানের ওপর নয়, পরিচালনাকারীদের দক্ষতার ওপরও নির্ভর করে। তিনি বলেন, ‘বিমানগুলো কীভাবে স্থল ও আকাশভিত্তিক রাডার, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানবিক দক্ষতার সঙ্গে একীভূত হয়—সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
জেএফ-১৭–এর প্রতি আগ্রহ কেন বাড়ছে
২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে চার দিনের সংঘাতে পাকিস্তান বিমানবাহিনী আবারও আলোচনায় আসে। বিশেষ করে ৭ মে রাতে, যখন ভারতীয় বিমান পাকিস্তানের ভেতরে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। পিএএফের দাবি অনুযায়ী, চীনা নির্মিত জে-১০সি জেট ব্যবহার করে পাকিস্তানি স্কোয়াড্রন অন্তত ছয়টি ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করে। ভারত প্রথমে এই দাবি অস্বীকার করলেও পরে ‘কিছু’ বিমান হারানোর কথা স্বীকার করে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি করানোর কৃতিত্ব দাবি করেছেন, বারবার পাকিস্তানি জেটের পারফরম্যান্সের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে ভারত এই দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। যদিও জেএফ-১৭ সরাসরি ভূপাতিত করার ঘটনায় জড়িত ছিল না, পিএএফ জানিয়েছে, এটি সেই অভিযানে অংশ নেওয়া ফরমেশনের অংশ ছিল।
তিন দিন পর, ১০ মে, আইএসপিআর দাবি করে যে—একটি জেএফ-১৭ দিয়ে ভারতের রুশ নির্মিত এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। ভারত এই দাবি অস্বীকার করে। ইসলামাবাদভিত্তিক ওই বিশ্লেষক বলেন, মে মাসের সংঘাতকে ব্যবহার করে পাকিস্তান জেএফ-১৭–কে যুদ্ধ প্রমাণিত ও সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে বাজারজাত করছে। তবে তিনি সতর্ক করেন, ‘সম্ভাব্য ক্রয়’ শব্দটি সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে আগ্রহ প্রকাশ থেকে চুক্তি সই ও সরবরাহ পর্যন্ত যেতে সাধারণত বহু বছর লাগে।’
অন্যান্য পর্যবেক্ষকরাও মনে করেন, ইসলামাবাদ এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিরক্ষা রপ্তানি বাড়াতে এবং নিজেকে একটি উদীয়মান মধ্যম শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। জেএফ-১৭ প্রকল্পে যুক্ত অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রের পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মানদণ্ড। তিনি বলেন, ‘খুব কম দেশই যুদ্ধবিমান তৈরি করে। বাজারের বড় অংশ পশ্চিমা নির্মাতাদের দখলে, যারা প্রায়ই নানা শর্ত আরোপ করে। কিন্তু সবাই বৈচিত্র্য চায়, এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখতে চায় না। সেখানেই পাকিস্তানের সুযোগ।’
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর পাকিস্তানের প্রতি ঢাকার অবস্থান দ্রুত বদলেছে। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের চুক্তি শুধু একটি প্ল্যাটফর্ম বা বিমান বিক্রির বিষয় নয়। এটি জাতীয় পর্যায়ের সহযোগিতা ও কৌশলগত সামঞ্জস্যের প্রতিফলন।’ তিনি আরও বলেন, যুদ্ধবিমান একটি দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার, যার আয়ুষ্কাল তিন থেকে চার দশক।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যদি জেএফ-১৭ বা সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান নেয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তারা দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও বিক্রয়োত্তর সেবার জন্য প্রস্তুত। একই সঙ্গে তারা চীনা জে-১০–এর প্রতিও আগ্রহ দেখাচ্ছে, যা কৌশলগতভাবে ভবিষ্যতে তারা কার সঙ্গে অবস্থান নেবে, সেটিও ইঙ্গিত করে।’
আল–জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান