হোম > বিশ্লেষণ

দিল্লি যাবেন না, মুম্বাইয়ে বৈঠক করবেন রুবিও, ভারতকে কী বার্তা দিল যুক্তরাষ্ট্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও । ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আগামী সপ্তাহে ভারত সফর করবেন। তবে তিনি দেশটির রাজধানী নয়া দিল্লিতে যাবেন না। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতি অনুযায়ী, এর পরিবর্তে রুবিও আগামীকাল সোমবার ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাইতে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং এরপর পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটের জামনগরে একটি তেল শোধনাগার পরিদর্শন করবেন।

ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত কিছুদিন আগে জানান, ওয়াশিংটন আশা করে জয়শঙ্কর রুবিওর সঙ্গে দেখা করতে (মুম্বাইতে) যাবেন। তখনই রুবিও এই সফরসূচি নিয়ে রাজনৈতিক ঝড় ওঠে। এর প্রেক্ষিতে বিরোধী নেতারা ভারত সরকারকে তাদের শীর্ষ কূটনীতিককে নিজ দেশের মাটিতেই ‘তলব’ করার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।

এমন এক সময়ে এই বাদানুবাদ সামনে এলো যখন বাণিজ্য, শুল্ক এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের খনিজ তেল কেনা নিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক উত্তপ্ত অবস্থায় রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো—রুবিও কেন নতুন দিল্লি এড়িয়ে চলছেন, আর এতেই বা কেন এত অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে?

ভারত সফরে রুবিও কী করবেন

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বাণিজ্য, জ্বালানি এবং বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করার পরিকল্পনা করছেন। রুবিও মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশের সঙ্গে ‘সি ৫ +১’ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর রোববার উজবেকিস্তানের তাসখন্দ থেকে ভারতে পৌঁছাবেন।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ভারতে তিনি মার্কিন-ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করতে প্রবীণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করবেন এবং ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও এজেন্ডাটি নিশ্চিত করে শুক্রবার জানিয়েছেন, মুম্বাইয়ের আলোচনায় জ্বালানি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর খবর অনুযায়ী, জামনগরে রুবিও ভারতীয় ধনকুবের মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ পরিচালিত বিশ্বের বৃহত্তম একক-সাইট শোধনাগার পরিদর্শন করবেন এবং আম্বানি পরিবারের আয়োজিত একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।

কেন রুবিও নতুন দিল্লিতে যাচ্ছেন না

এর কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ দেওয়া হয়নি। রুবিও চলতি বছরের মে মাসে কোয়াড—যাতে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া অন্তর্ভুক্ত—এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দিতে ভারতের রাজধানীতে এসেছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তার আসন্ন সফরটিকে জ্বালানি ও বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে সাজিয়েছে, এবং রুবিওর ভারত সফরের দ্বিতীয় গন্তব্য জামনগর হলো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি জ্বালানি হাব।

আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়াও এই সফরের অন্যতম একটি প্রেক্ষাপট। জ্বালানি, খুচরা বিক্রি এবং টেলিকমিউনিকেশন খাতের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ওয়াশিংটনের বৃহৎ তেল কূটনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

ভারতের অর্থনীতি বিষয়ক দৈনিক বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, জামনগর সফরটি তাৎপর্যপূর্ণ কারণ ওয়াশিংটন যখন ভারতকে আরও তেল কেনার তাগিদ দিচ্ছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর রিলায়েন্সই হলো ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার পর দেশটির তেল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে আসে। এরপর থেকে মার্কিন সরকার বিদেশে ক্রেতাদের কাছে ভেনেজুয়েলার তেল বিপণন করছে।

বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড আরও জানিয়েছে, টেক্সাসে একটি নতুন শোধনাগারে রিলায়েন্স বিনিয়োগ করছে, যা গত ৫০ বছরের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত প্রথম শোধনাগার হতে যাচ্ছে। গত মার্চ মাসে ট্রাম্প যখন এটি ঘোষণা করেছিলেন, তখন তিনি এটিকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত কী বলেছিলেন এবং কেন এটি অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে?

গত বৃহস্পতিবার নতুন দিল্লিতে ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর বলেন, রুবিও মুম্বাইতে ভারত সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করবেন এবং ওয়াশিংটন ‘আশা করে’ জয়শঙ্কর এবং নতুন দিল্লির অন্যরা তার সঙ্গে দেখা করতে সেখানে যাবেন। তবে, চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে জয়সওয়াল এই সফরটি নিশ্চিত করেননি বা রুবিও কেন নতুন দিল্লি এড়িয়ে যাচ্ছেন তাও ব্যাখ্যা করেননি। তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে ভারত সরকার ‘উপযুক্ত সময়ে’ এটি ঘোষণা করবে।

বিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ এক্সে লিখেছেন যে রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যটি ছিল ‘বেশ অসাধারণ বা অদ্ভুত।’ ভারতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীও শুক্রবার এক্সে মন্তব্য করে লেখেন, রুবিও ‘তাঁর কর্মচারীকে মুম্বাইতে তলব করেছেন।’

কংগ্রেস এমপি পবন খেরা আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ‘মোদি সরকারের মানদণ্ড বিবেচনা করলেও, কোনো বিদেশী সরকার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ভারতের মাটিতেই তলব করা এক নতুন নিম্নমানের দৃষ্টান্ত।’

কেন যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন

প্রধানত ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং রাশিয়ার তেলের কারণে। গত বছর আগস্টে এক দফা বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র অধিকাংশ ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। তবে দুই পক্ষ ফেব্রুয়ারিতে যে কাঠামোতে সম্মত হয়, তার অধীনে সেই হার কমে ১৮ শতাংশে নেমে আসে।

তারপর থেকে দুই দেশের মধ্যকার আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছে। দ্য হিন্দুর তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সিথারমন বলেছেন আলোচনাগুলো এক জায়গায় থমকে গেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বৃহস্পতিবার বলেছেন যে চুক্তির "প্রথম ধাপটি" চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, তবে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় ভারতীয় রপ্তানিকারকরা সুবিধা না পাওয়া পর্যন্ত ভারত এতে স্বাক্ষর করবে না।

এ ছাড়াও অন্যান্য বিরোধপূর্ণ বিষয়ও সামনে এসেছে।

গত সপ্তাহে মার্কিন শ্রমসচিব কিথ সান্ডারলিং ঘোষণা করেছেন, তাঁর বিভাগ একটি লেবার সার্টিফিকেশন স্কিম থেকে তথ্যপ্রযুক্তি জায়ান্ট ইনফোসিস, টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস, উইপ্রো এবং এইচসিএল-সহ আটটি ভারতীয় সংস্থাকে স্থগিত করেছে। এই স্কিমটি নিয়োগকর্তাদের তাদের বিদেশী কর্মীদের জন্য গ্রিন কার্ড আবেদনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

কার্নেগি অ্যান্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের দক্ষিণ এশিয়া প্রোগ্রামের সিনিয়র ফেলো সামির লালওয়ানি এই সপ্তাহে লিখেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ভারতীয় জনমত সর্বকালের সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। এর কারণ হিসেবে তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধকে উল্লেখ করেছেন—যা তার মতে ভারতকে আবার রাশিয়ার তেলের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

তা সত্ত্বেও তিনি যুক্তি দেখান, দুই দেশের মধ্যকার প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নীরবে আরও গভীর হয়েছে এবং ২০২৫ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তাঁর মতে, ‘রাজনৈতিক সম্পর্কের কৌশলগত ভিত্তির চেয়েও মানুষের মনোভাব ও ধারণার অবনতি দ্রুত ঘটেছে।’

একটি নিষেধাজ্ঞা আইন পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করার হুমকি দিয়েছিল। গত মাসে ট্রাম্প ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাঙ্কশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্টে’ স্বাক্ষর করেন। এই নিষেধাজ্ঞা বিল রাশিয়ার তেল বা গ্যাসের শীর্ষ পাঁচটি আমদানিকারক দেশের পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারে।

রাশিয়ার তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা ভারত ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলেছিল যে এই নতুন শুল্ক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে। তবে আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন নির্বাচনের আগে তেলের চড়া দাম কমানোর চেষ্টার অংশ হিসেবে ট্রাম্প শুক্রবার এক নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করে ভারতের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল/মওকুফ করার পদক্ষেপ নেন।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

হুয়াওয়ে যেভাবে চীনের সফট পাওয়ারের হাতিয়ার হয়ে উঠল

বাংলাদেশের মতো সরকার পতনে বিজেপি কেন সতর্ক করছে

ইয়েমেনের তাইজ দখলের লড়াই কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

বিপুল সামরিক ব্যয় সত্ত্বেও কেন হুতিদের সামনে নাকাল সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র কেন দূরে

৯৬% মুসলিমের দেশ আজারবাইজানে কেন বিদ্যালয়ে হিজাবে নিষেধাজ্ঞা

নেহা বোরার সংগঠন আইসা কী, তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যইবা কী

গাজায় আগ্রাসন যেভাবে মোদির ভারতকে ইসরায়েলঘনিষ্ঠ করে তুলল

ইসরায়েলি দখল-গণহত্যার বিপরীতে মৌলিক প্রশ্ন—গাজা শাসন করবে কে

গাজায় গণহত্যা যেভাবে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনে টেনে এনেছে নিরীহ ব্রিটিশদের

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও ৫ কারণে ভারতের শেয়ারবাজার গাড্ডায়