হোম > বিশ্লেষণ

বিপুল সামরিক ব্যয় সত্ত্বেও কেন হুতিদের সামনে নাকাল সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র কেন দূরে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

গত মার্চ থেকেই মক্কায় পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করেছে সৌদি আরব। ছবি: সৌদি প্রেস এজেন্সি

অত্যাধুনিক মার্কিন ও ইউরোপীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট থাকা সত্ত্বেও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সৌদি আরব।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৮৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে বিশ্বের শীর্ষ সামরিক ব্যয়ের দেশগুলোর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে রিয়াদ। যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ও থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য থেকেও উন্নত মানের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে দেশটি।

তবে এই বহুমুখী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেও সম্প্রতি রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দর, আরামকো তেল শোধনাগার এবং ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রাণঘাতী ও মারাত্মক হামলা চালিয়েছে হুতিরা।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের ভূমির বিশালতা এবং তিন দিক থেকে আসা বহুমুখী নিরাপত্তাহীনতাই এই মুহূর্তে রিয়াদের আকাশ সুরক্ষাকে চরম পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড ও বহুমুখী হুমকি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ আয়তনের এই দেশটির সুরক্ষায় বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও বিশাল ভৌগোলিক অবস্থানই রিয়াদের মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সৌদি আরবকে একই সঙ্গে তিনটি প্রধান দিক থেকে আসা হামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে:

পূর্ব দিক: চলতি বছরে সংঘাতের চরম মুহূর্তে ইরান থেকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সৌদি লক্ষ্যবস্তু অভিমুখে ছোড়া হয়েছে।

উত্তর দিক: ইরাকের ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো দূরনিয়ন্ত্রিত ড্রোন পাঠিয়ে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনে আঘাত হেনেছে।

দক্ষিণ দিক: ইয়েমেনের পাহাড়ি অঞ্চল ও মোবাইল লাঞ্চার ব্যবহার করে হুতি বিদ্রোহীরা ক্রমাগত ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে।

একটি স্বাধীন অর্থনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষণকারী মাধ্যম ‘ভিশন ২০৩০. এআই’-এর মতে, সৌদি সুরক্ষার অর্থ কেবল রিয়াদ বা নির্দিষ্ট কোনো শোধনাগার রক্ষা করা নয়; বরং বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত কৌশলগত নেটওয়ার্ক রক্ষা করা। রাডার ব্যবস্থার মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে হুমকি শনাক্ত করা, কোন ক্ষেপণাস্ত্রটি আকাশেই ধ্বংস করতে হবে তা নির্ধারণ করা এবং বেসামরিক নাগরিকদের সতর্ক করার মতো জটিল প্রক্রিয়াগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়।

সৌদি সামরিক সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, যদিও সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হুতিদের ছোড়া বহু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে ধ্বংস করতে সক্ষম হচ্ছে, তবে সব হুমকি ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। একাধিক স্থানে একযোগে হামলার ঝুঁকিতে থাকায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো কোথায় কীভাবে বিন্যস্ত করা হবে, তা নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের সম্মুখীন হতে হচ্ছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে।

হুতিদের সামরিক কৌশল ও প্রযুক্তির অগ্রগতি

সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত ও পরাস্ত করতে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে দীর্ঘপাল্লার ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহার করার কৌশল গ্রহণ করেছে। সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কৌশলটি ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহৃত কৌশলগুলোর সঙ্গে অনেকটাই দৃশ্যমান সাদৃশ্য বহন করে।

কম উচ্চতায় উড়ে আসা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে রাডারে সহজে শনাক্ত করা যায় না। এ ছাড়া হুতিরা সম্প্রতি ‘হাতেম-২’ এবং ‘ফিলিস্তিন-২’ নামের নতুন প্রজন্মের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার শুরু করেছে, যেগুলো দ্রুতগতির এবং লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও হুতিদের সরবরাহ করা অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম এবং ড্রোনগুলোর উৎস মূলত ইরান। ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজেদ আল-নাজিলি জানান, হুতিরা তাপ-সংবেদনশীল ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রায় ২৫ মিনিট পর্যন্ত আকাশে অবস্থান করতে সক্ষম এমন পরিবর্তিত প্রতিরক্ষা সরঞ্জামও ব্যবহার করছে।

গত বছর হুতিদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের বিশ্বখ্যাত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হেনেছিল, যা সামরিক বিশ্লেষকদের মতে ২ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে নিক্ষেপ সত্ত্বেও চরম নির্ভুলতার প্রমাণ দেয়।

যুবরাজ সালমানের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’-এর মূল লক্ষ্য সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও পর্যটনের শীর্ষ কেন্দ্রে পরিণত করা। তবে বিমানবন্দর, ডেটা সেন্টার ও পানি শোধনাগারের মতো অবকাঠামোতে বারবার হামলা সেই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও বৈশ্বিক আস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

রিয়াদ বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী হামলার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশটিকে এখন কয়েকটি অত্যন্ত কঠিন রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে:

১. উত্তেজনা বৃদ্ধি ও সামরিক তৎপরতা জোরদার করা: হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা আরও তীব্র করা হলে পাল্টা হামলার ঝুঁকি বাড়বে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের আস্থা আরও ক্ষুণ্ন করতে পারে।

২. কূটনৈতিক সমঝোতা: বিমানবন্দরে বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর পর হুতিদের সঙ্গে রাজনৈতিক নমনীয়তা বা সমঝোতা দেখানো অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিক থেকে অত্যন্ত অস্বস্তিকর।

ইতিমধ্যে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের কাছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে এবং রিয়াদের প্রস্তাবিত সাময়িক যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করেছে। অপরদিকে ইরান এই সংকটে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিলেও হুতিরা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানে অনড় রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মিত্র ও ভবিষ্যতের সমীকরণ

সংকট মোকাবিলায় সৌদি আরব একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক জোট গঠনের চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে পাকিস্তান ও মিসর নিরাপত্তার স্বার্থে সৈন্য ও সামরিক সহায়তা প্রদান বা প্রস্তাব করেছে।

তবে সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশলের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়াতে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন। পেন্টাগনের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ সংঘাতের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের অস্ত্র মজুতেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর বিশ্লেষক ও সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি উল্লেখ করেন, ‘আক্রান্ত হওয়ার পর রাজনৈতিক কারণে সৌদি আরবকে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাতেই হবে। তবে দিন শেষে আমাদের আবার এক ধরনের কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার দিকেই ফিরে যেতে হবে—যা হয়তো পুরোপুরি সন্তোষজনক হবে না, কিন্তু উত্তেজনা প্রশমিত করতে সক্ষম হবে।’

ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার সশস্ত্র সদস্য নিয়ে সুসংগঠিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কেবল আকাশপথের হামলায় পূর্ণ জয় পাওয়া অসম্ভব বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। ফলে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই এখন রিয়াদে নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।