হোম > বিশ্লেষণ

স্যামসন অপশন: ইসরায়েলের পরমাণু ডকট্রিন কেন বিশ্বের জন্য হুমকি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইসরায়েলের নেগেভ নিউক্লিয়ার রিসার্চ সেন্টার। ছবি: এএফপি

দশকের পর দশক ধরে বিশ্ব ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারকে একধরনের অস্বস্তিকর গোপন সত্য হিসেবে দেখেছে। সবাই জানে যে আছে, কিন্তু খুব কম মানুষই তা খোলাখুলি আলোচনা করতে রাজি। ইসরায়েল কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি যে তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। তবুও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপকভাবে বোঝাপড়া আছে যে দেশটি উল্লেখযোগ্য পারমাণবিক সক্ষমতা বজায় রেখেছে।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলের কাছে আনুমানিক প্রায় ৮০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। পাশাপাশি এমন ডেলিভারি সিস্টেমও আছে—যার মধ্যে বিমান ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এই অস্ত্রভান্ডার পরিচালনার নীতিকে বলা হয় ‘নিউক্লিয়ার অপাসিটি বা পারমাণবিক অস্পষ্টতা।’

ইসরায়েল তাদের অস্ত্রের অস্তিত্ব না নিশ্চিত করে, না অস্বীকার করে। বাস্তবে এই দ্ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া থেকে এড়িয়ে যেতে দিয়েছে: ঠিক কোন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল বাস্তবে এই অস্ত্র ব্যবহার করবে?

এই প্রশ্ন আজ কয়েক দশকের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে এক বিপজ্জনক যুদ্ধে জড়িত। শনিবার ইরান ইসরায়েলের দিমোনা শহরে হামলা চালায়, যেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা রয়েছে। এর মাধ্যমে তারা দেখিয়েছে যে নিজেদের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার সক্ষমতা তাদের আছে।

ইসরায়েলের কৌশলগত চিন্তাধারা দীর্ঘদিন ধরেই অস্তিত্বগত হুমকির আশঙ্কা দিয়ে প্রভাবিত। অধিকাংশ পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র যেখানে প্রতিরোধ বা অন্য পারমাণবিক শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ করে, সেখানে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ন্যারেটিভ দাঁড়িয়ে আছে এই বিশ্বাসের ওপর যে—যুদ্ধ যদি তাদের বিরুদ্ধে নির্ণায়কভাবে মোড় নেয়, তবে দেশটি ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে। ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান ইরান এবং গাজা ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘাত—সবকিছুকেই ইসরায়েলি নেতারা বারবার জাতীয় অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছেন। পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসঙ্গে এই মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অধিকাংশ পারমাণবিক নীতিতে অস্ত্র ব্যবহারের সীমা ইচ্ছাকৃতভাবে অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ে রাখা হয়। পারমাণবিক অস্ত্র মূলত অন্য পারমাণবিক শক্তিকে প্রতিরোধ করার জন্য। কিন্তু ইসরায়েলের কৌশলগত চিন্তায় একটি ভিন্ন উপাদান রয়েছে—এমনকি কোনো অ-পারমাণবিক রাষ্ট্র থেকেও যদি দেশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে হয়, তবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।

কৌশলগত আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে ‘স্যামসন অপশন’ নামে পরিচিত একটি ধারণা আলোচিত হয়েছে। এই অপশন বা ডকট্রিনের মানে—পরাজয়ের মুখে পড়লে ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্রের আশ্রয় নিতে পারে। এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক নীতি বাস্তবে আছে কি না তা স্পষ্ট নয়, কিন্তু এর পেছনের যুক্তি পরিষ্কার। কোনো রাষ্ট্র যদি সত্যিই বিশ্বাস করে যে তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে, তবে নাটকীয়ভাবে সংঘাত বাড়ানোর চাপ অনেক বেশি হয়ে ওঠে।

ইসরায়েলের স্যামসন অপশন দেশটির অপ্রকাশিত কিন্তু বহুল আলোচিত পারমাণবিক রণকৌশল। বাইবেলের শক্তিশালী বীর ‘স্যামসনে’র নামানুসারে এর নামকরণ। স্যামসন নিজের জীবনের বিনিময়ে শত্রুদের বিনাশ করেছিলেন। বাইবেলের কাহিনি অনুসারে, স্যামসন যখন ফিলিস্তিনিদের হাতে বন্দী হন, তখন তিনি তাঁর শেষ শক্তি দিয়ে মন্দিরের বিশাল স্তম্ভগুলো ভেঙে ফেলেন। এতে তিনি নিজে মারা গেলেও তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েক হাজার শত্রুও মারা যায়। ইসরায়েলের সামরিক চিন্তাবিদদের মতে, যদি কোনো দেশ বা জোট ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে দিতে চায়, তবে ইসরায়েল তার পারমাণবিক সক্ষমতা ব্যবহার করে সেই দেশগুলোকেও সঙ্গে নিয়ে ধ্বংস হবে।

ইসরায়েলের বর্তমান আঞ্চলিক অবস্থান বিবেচনায় এই উদ্বেগ আরও তাৎপর্যপূর্ণ। গাজা থেকে লেবানন, সিরিয়া ও ইরান পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিস্তৃত এক জটিল সংঘাত ও মোকাবিলার জালে ইসরায়েল জড়িয়ে আছে। বহু ফ্রন্টে একসঙ্গে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আর কেবল তাত্ত্বিক নয়।

এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি নেতারা নিজেদেরকে শুধু একটি প্রচলিত যুদ্ধ লড়ছে বলে নয়, বরং একটি আঞ্চলিক জোটের মুখোমুখি বলে মনে করতে পারেন। কোনো রাষ্ট্র যত বেশি তার যুদ্ধকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে ব্যাখ্যা করে, ততই চরম মাত্রায় সংঘাত বাড়ানোর মানসিক বাধা কমে যায়। এ কারণেই অধিকাংশ দেশের পারমাণবিক নীতি কঠোর কৌশলগত কাঠামো ও আন্তর্জাতিক তদারকির মাধ্যমে সীমাবদ্ধ রাখা হয়।

কিন্তু ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার প্রায় পুরোপুরিই আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তি (এনপিটি) স্বাক্ষরকারী নয় এবং তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো অধিকাংশ দেশের মতো একই ধরনের পরিদর্শন ব্যবস্থার আওতায় পড়ে না। এর ফলে বৈশ্বিক নিরাপত্তায় একটি বিরল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র, যার সক্ষমতা ও নীতিমালা আন্তর্জাতিক নজরদারির বাইরে রয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার ঠেকানোর দিকে বিশ্ব যখন দশকের পর দশক মনোযোগ দিয়েছে, তখন অঞ্চলের একমাত্র বিদ্যমান পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার প্রায় বিতর্কের বাইরেই থেকে গেছে।

গাজায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও সংঘাতের মাত্রা কত দূর যেতে পারে তা নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে এবং অঞ্চলটির অবকাঠামোর প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস সাধিত হয়েছে। পুরো পাড়া-মহল্লা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। হাসপাতাল, স্কুল এবং বেসামরিক অবকাঠামো বারবার আঘাতের শিকার হয়েছে। ধ্বংসের এই মাত্রাকে অনেক মানবাধিকার সংস্থা ও আইনবিদ গণহত্যাসদৃশ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

বোমাবর্ষণের তীব্রতা ছিল অসাধারণ। কিছু সামরিক বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়েই গাজায় যে বিস্ফোরক শক্তি ব্যবহার করা হয়েছে তা হিরোশিমা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ শক্তির কয়েক গুণের সমান। এই তুলনা পারমাণবিক ও প্রচলিত অস্ত্রকে সমতুল্য বলে দাবি করে না। একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণের ধ্বংসযজ্ঞ অনেক বেশি ভয়াবহ হবে। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে—জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে বলে বিশ্বাস করলে ইসরায়েলি নেতারা কতটা ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত। যদি কোনো রাষ্ট্র প্রচলিত অস্ত্র দিয়েই এমন বিপুল ধ্বংস চালাতে রাজি থাকে, তবে প্রশ্ন ওঠে: যদি তারা মনে করে যে তারা যুদ্ধ হারছে, তবে তাদের সীমা কোথায়?

কৌশলগত আলোচনায় খুব কম আলোচিত আরেকটি বিষয় হলো ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ। বর্তমান সরকারকে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোরপন্থী সরকারগুলোর একটি বলা হয়, যেখানে এমন মন্ত্রীরাও আছেন যারা ফিলিস্তিনি ও আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের বিষয়ে প্রকাশ্যে চরম অবস্থানের পক্ষে কথা বলেন। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলি সমাজেও উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে, যেখানে আরও জাতীয়তাবাদী ও সামরিকমুখী নীতির প্রতি সমর্থন বেড়েছে। এর ফলে কোন পরিস্থিতিকে ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তার সীমাও আরও নিচে নেমে আসতে পারে।

এই সবকিছুই বাকি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো এবং সম্ভাব্য পারমাণবিক বিপর্যয় ঠেকানোর দায়িত্বে থাকা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত। আর ইরানের সঙ্গে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

ইরান ফাঁদে পা দিয়ে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ডোবাচ্ছেন ট্রাম্প

পুরো ইউরোপ কি এখন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালে

নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেলথ মিথ ভেঙে দিল ইরান, যা বলছেন চীনা সমরবিদ

ইরানকে ‘শায়েস্তা’ করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে সওয়ার হতে চায় অক্ষম সৌদি-আমিরাত

তেলের যুদ্ধে জিতে যাচ্ছে ইরান: জাপানের সঙ্গে আলোচনায় তেহরান, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল

ইরান আক্রমণ: ৫০ বছর কোনো প্রেসিডেন্ট সাহস করেননি, ট্রাম্প কেন ঝুঁকি নিলেন

জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলায় উন্মুক্ত ‘প্যান্ডোরার বাক্স’, উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ এখন তেহরানের হাতে

লক্ষ্য অর্জনে বারবার ব্যর্থ, তবুও কেন গুপ্তহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল

ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন নয়: ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটি অন্য কিছু

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য আলাদা