ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এই সংকটের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক বিশাল ওলটপালট শুরু হয়েছে, যেখানে রাশিয়া অভাবনীয় মুনাফা অর্জন করলেও এশিয়ার দেশগুলো ভয়াবহ অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের (Kpler) জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মুয়ু সু আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা জ্বালানি বাজারের সমীকরণ আমূল বদলে দিচ্ছে।
মুয়ু সুর মতে, হরমুজ প্রণালির এই সংকটের ফলে সবচেয়ে বড় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে রাশিয়া হচ্ছে বাজারের সবচেয়ে স্পষ্ট সুবিধাভোগী। মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ভারতীয় ক্রেতারা এখন সানন্দে রাশিয়ার তেল কিনছে।’
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক থেকে দুই সপ্তাহে রাশিয়া বিশ্ববাজারে তিন কোটি ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল ছেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের জাহাজগুলো যেখানে অনিশ্চয়তায় ভুগছে, সেখানে রাশিয়ার তেলের দ্রুত সরবরাহ নিশ্চয়তা বর্তমান অস্থিতিশীল বাজারে বিপুলভাবে সমাদৃত হচ্ছে।
রাশিয়ার পাশাপাশি ব্রাজিল ও কানাডার তেল উৎপাদনকারীরাও বিশ্ববাজারে তেলের আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে তাদের মুনাফায় উল্লম্ফন দেখতে পাচ্ছে।
এই সরবরাহ বিভ্রাটের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে এশিয়ার দেশগুলো। বিশ্লেষকেরা এই দেশগুলোকে এই সংকটের ‘বিগ লুজার’ বা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
মুয়ু সু বলেন, ‘বিশেষ করে যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল কিন্তু যাদের নিজস্ব মজুত তুলনামূলকভাবে কম, তারা গভীর সংকটে রয়েছে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এই তালিকায় সবার ওপরে। কারণ, এই দেশগুলোর কাছে আপত্কালীন মজুত খুবই নগণ্য, যা দিয়ে কয়েক দিনের বেশি শিল্পোৎপাদন বজায় রাখা সম্ভব নয়।’
এদিকে সংকট মোকাবিলায় দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান তাদের জাতীয় জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার পরিকল্পনা করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, এই যুদ্ধ বা উত্তেজনা যদি এক মাসের বেশি স্থায়ী হয়, তবে সেই মজুত দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না।
বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক দেশ চীনের হাতে বর্তমানে ১৩০ কোটি ব্যারেল তেলের বিশাল মজুত রয়েছে। কিন্তু মুয়ু সু উল্লেখ করেছেন, এত বড় মজুত থাকা সত্ত্বেও বর্তমান ঘাটতি তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ করার মতো কোনো বিকল্প উৎস চীনের কাছে নেই। এশিয়ার দেশগুলো ব্রাজিল বা কানাডার মতো বিকল্প উৎস থেকে তেল কেনার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেও সেই তেল জাহাজীকরণের পর এসে পৌঁছাতে অন্তত দুই মাস সময় লাগবে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে—
১. মূল্যস্ফীতি: এশিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেবে। কারণ, পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
২. বাজারের নিয়ন্ত্রণ বদল: ওপেকের বদলে রাশিয়ার মতো অ-ওপেক দেশগুলোর হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৩. জ্বালানি নিরাপত্তা: এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে, যা সরাসরি দেশগুলোর জিডিপিতে প্রভাব ফেলবে।
হরমুজ প্রণালির এ সংকট যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়, তবে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে, যার সরাসরি সুফল ভোগ করবে রাশিয়ার মতো বৃহৎ উৎপাদনকারী দেশগুলো।