উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক ছবিতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং-উনকে বেশ সুস্থ-স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। অথচ এর কয়েক ঘণ্টা আগেই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এক চীনা ভিন্নমতাবলম্বী দাবি করেছিলেন, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হয়ে বেইজিংয়ের একটি হাসপাতালে কোমায় যাওয়ার পর কিমের মৃত্যু হয়েছে। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিবিসি জানায়, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র রোদং সিনমুন প্রকাশিত ছবিতে ৪২ বছর বয়সী কিমকে তাঁর মেয়ে কিম জু এ-কে সঙ্গে নিয়ে একটি পোশাক ও জুতা প্রদর্শনী পরিদর্শন করতে দেখা যায়। সঙ্গে ছিলেন তাঁর নিয়মিত কর্মকর্তারাও। ছবিগুলো ঠিক কবে তোলা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপকে জানিয়েছেন, কিমের মৃত্যুর গুজবের পক্ষে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
সর্বশেষ এই গুজব ছড়ান চীনা গণতান্ত্রিক দলের চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেওয়া ওয়ানজুন শিয়ে। চীনে নিষিদ্ধ সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত শিয়ে এর আগেও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মৃত্যু নিয়ে ভিত্তিহীন দাবি করেছিলেন। এবার তাঁর অভিযোগ, উত্তর কোরিয়ায় উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় কিমকে বেইজিংয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁর মৃত্যু হলে মরদেহ গোপনে উত্তর কোরিয়ায় ফিরিয়ে আনা হয় এবং বিষয়টি আড়াল করে রাখা হয়।
উত্তর কোরিয়াকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণকারীদের কাছে এ ধরনের গুজব অবশ্য নতুন নয়। ২০২০ সালেও দেশটি থেকে পালিয়ে আসা আলোচিত এক নাগরিক দাবি করেছিলেন, হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচারের পর কিমের মৃত্যু হয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি ‘৯৯ শতাংশ নিশ্চিত’ বলেও আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরই কিমকে জনসমক্ষে দেখা গেলে ভেস্তে যায় ওই দাবি।
কিমের মৃত্যুর গুজব বারবার ফিরে আসার অন্যতম কারণ দেশটির ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা। তিন প্রজন্ম ধরে কিম পরিবার উত্তর কোরিয়া শাসন করছে। তবে কিম জং-উনের পর কে ক্ষমতায় আসবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কিমের দাদা কিম ইল সুং বহু বছর ধরে তাঁর ছেলে কিম জং ইলকে উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করেছিলেন। ১৯৯৪ সালে কিম ইল সুংয়ের মৃত্যুর সময় উত্তরাধিকার পরিকল্পনা তাই সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। অন্যদিকে, ২০০৮ সালে কিম জং ইল স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর কনিষ্ঠ ছেলে কিম জং-উনকে দ্রুত ক্ষমতার জন্য প্রস্তুত করা হয়। ২০১১ সালে বাবার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় এলেও প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে তাঁকে কয়েক বছর ব্যয় করতে হয়েছিল।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, কিম তাঁর মেয়ে কিম জু এ-কে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করছেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও সামরিক প্রদর্শনীতে মেয়ের উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে। কিমের মেয়ের বয়স আনুমানিক ১৩ বছর। উত্তর কোরিয়ার ইতিহাসে কোনো নারী দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হননি, আর কিম জু এ-কে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরসূরি ঘোষণা করা হয়নি। ফলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
কিমের স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগের বাস্তব কারণ রয়েছে। তিনি অতিরিক্ত ওজনের অধিকারী এবং নিয়মিত ধূমপান করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা একাধিকবার সতর্ক করেছে, তাঁর জীবনযাপন হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কিম পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে।
কিমের আকস্মিক মৃত্যু হলে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে কট্টরপন্থীরা আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারেন, কিংবা অস্থিরতার কারণে চীনের সীমান্তে শরণার্থীর ঢল নামতে পারে। বেইজিং ও সিউলের পাশাপাশি ওয়াশিংটনের কাছেও বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৮ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে।
উত্তর কোরিয়া বিশ্বের সবচেয়ে গোপনীয় রাষ্ট্রগুলোর একটি। দেশটির নেতার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে খুব সীমিতসংখ্যক মানুষের। এমনকি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষেও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন। ফলে যাচাইহীন খবর সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।
কখনো কখনো উত্তর কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠীও প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করতে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে কিমের মৃত্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ খবর সত্য হলে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। কিন্তু সে কারণে প্রতিটি গুজবকে সত্য ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওয়ানজুন শিয়ে কী উদ্দেশ্যে এ দাবি করেছেন, তা নিশ্চিত নয়। তিনি হয়তো আলোচনায় আসতে চেয়েছেন, অথবা বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে চীনকে বিব্রত করার চেষ্টা করেছেন। তবে তাঁর দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না থাকায় কিমের মৃত্যুর খবরকে ভিত্তিহীন গুজব হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।