বাংলাদেশের বিশ্বের এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) শিল্পের অন্যতম সাফল্যের গল্প হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে দেশটি এখন এই শিল্পের জন্য এক সতর্কবার্তায় পরিণত হচ্ছে।
ভবিষ্যতে এলএনজির বড় বাজার হয়ে ওঠার জন্য বাংলাদেশকে যতটা উপযুক্ত মনে হয়, এমন দেশ খুব বেশি নেই। দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমে যাচ্ছে এবং এই ঘাটতি পূরণে নীতিনির্ধারকেরা এলএনজি আমদানির অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন।
কিন্তু এর মধ্যেই বাংলাদেশ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা এলএনজি বিনিয়োগকারীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
জ্বালানি বাজার বিষয়ক থিংক ট্যাংক এমবারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি গ্রীষ্মে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ছাড়িয়ে গেছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন। এটি এমন এক দেশের জন্য বড় পরিবর্তন, যে দেশে একসময় মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের ৯০ শতাংশেরও বেশি আসত গ্যাস থেকে।
জুলাইয়ে বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ৩ দশমিক ৯২ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বা ৩ লাখ ৯২ হাজার মেগাওয়াট ঘণ্টা। একই সময়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ৩ দশমিক ৬৬ টেরাওয়াট ঘণ্টা ৩ লাখ ৬৬ হাজার মেগাওয়াট ঘণ্টা। এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং উন্নয়নশীল বিশ্বের অন্যান্য দেশ কীভাবে গ্যাস ব্যবহার করবে, সেই প্রবণতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এলএনজি শিল্পের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির গল্প মূলত অল্প কয়েকটি বাজারের ওপর নির্ভর করছে। ইউরোপে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়তে থাকায় সেখানে এলএনজির চাহিদা ভবিষ্যতে স্থির হয়ে যেতে পারে অথবা কমতে পারে।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এখনো বড় গ্যাস আমদানিকারক। কিন্তু গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশেই বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেশি নির্মাণাধীন রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি সীমিত হতে পারে। চীনও গুরুত্বপূর্ণ বাজার। কিন্তু চীনের জ্বালানি কৌশল মূলত নিজস্ব পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো এবং বিদেশি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর দিকে কেন্দ্রীভূত।
ফলে এলএনজি শিল্পের নজর এখন উন্নয়নশীল এশিয়ার দিকে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে এলএনজির পরবর্তী প্রজন্মের ক্রেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র, কাতার এবং অন্যান্য দেশে যে বিপুল পরিমাণ নতুন এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, তার বড় অংশের চাহিদা তৈরি করবে এই দেশগুলো।
কিন্তু সমস্যা হলো, এই দেশগুলোর অনেকগুলোই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দাম-সংবেদনশীল জ্বালানি বাজারের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের সর্বশেষ বিদ্যুৎ উৎপাদনের তথ্য সেই সমস্যাটিই স্পষ্ট করে তুলেছে। এলএনজি আমদানির সুযোগ বাড়লেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের বাজার-অংশ কমছে এবং তুলনামূলক সস্তা কয়লা সেই জায়গা দখল করছে।
এটি এলএনজি শিল্পের প্রবৃদ্ধির পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের দেখতে চাওয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি ব্যবহারে এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ হলো খরচ। উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ দরকার। কিন্তু সেই বিদ্যুৎকে একই সঙ্গে এত সস্তা ও পর্যাপ্ত হতে হবে, যাতে শিল্পের প্রবৃদ্ধি এবং দ্রুত বাড়তে থাকা শহুরে জনসংখ্যার চাহিদা মেটানো যায়।
অনেক ক্ষেত্রে এই অর্থনৈতিক প্রয়োজন পরিবেশগত উদ্বেগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর সেখানেই এলএনজি সমস্যায় পড়ে। নিজস্ব দেশীয় জ্বালানি উৎসের তুলনায় এলএনজি আমদানিকারকদের আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের দামের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এবং ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে গ্যাসের ক্রেতারা খুব কঠিন একটি শিক্ষা পেয়েছেন—আমদানি করা গ্যাসের দাম হঠাৎ অত্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম হামলার পর থেকে এশিয়ায় এলএনজির দাম প্রায় প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) ১১ ডলার থেকে বেড়ে ২৫ ডলারেরও বেশি হয়েছে। মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) হলো প্রাকৃতিক গ্যাস বা জ্বালানি পুড়িয়ে কতটুকু তাপ বা শক্তি পাওয়া যাবে তা পরিমাপের একটি বড় আন্তর্জাতিক একক। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুসারে, এই মূল্যবৃদ্ধি দাম-সংবেদনশীল ক্রেতাদের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
অবশ্য কয়লারও নিজস্ব ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু এশিয়ার বাজারে কয়লা এখনো এলএনজির তুলনায় অনেক সস্তা। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের হিসাব অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা কয়লার সমতুল্য জ্বালানি মূল্য প্রায় ৬ দশমিক ৫০ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ, আর ইন্দোনেশিয়ার কয়লার ক্ষেত্রে তা প্রায় ৫ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ। সরকারগুলো যখন বিদ্যুতের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে চায়, তখন এই দামের পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, এটি সম্ভবত একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রবণতার অংশ। এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাসের অংশ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। এর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান ও ভারত, যাদেরও একসময় সম্ভাবনাময় বড় এলএনজি বাজার হিসেবে দেখা হতো।
এমনকি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি আমদানিকারক জাপানেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের অংশ কমেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিষয়ক থিঙ্ক-ট্যাংক এমবারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে জাপানের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশেরও বেশি গ্যাস থেকে এলেও চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সেই অংশ কমে প্রায় ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
চীনেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহারের মাত্রা কমছে। চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি আমদানিকারক হয়ে উঠলেও দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ভূমিকা এখনো খুবই সীমিত। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত চীনের বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ এসেছে গ্যাস থেকে।
এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমে যাওয়ার এই প্রবণতা একটি প্রচলিত ধারণাকে দুর্বল করে দেয়। সেই ধারণা হলো, বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেই গ্যাসের ব্যবহারও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে।
বাস্তবে এশিয়ার বড় একটি অংশে গ্যাস এখন দুই দিক থেকে চাপে পড়ছে। একদিকে দ্রুত বাড়ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন। অন্যদিকে এমন একটি কয়লা খাত রয়েছে, যাকে সরিয়ে দেওয়া এখনো কঠিন।
জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে আলোচনায় এতদিন একটি ধারণা বেশ প্রচলিত ছিল। ধারণাটি ছিল, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রথমে গ্যাস ধীরে ধীরে কয়লাকে সরিয়ে দেবে। এরপর নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্যাটারি প্রযুক্তি গ্যাসকেও ধীরে ধীরে সরিয়ে দেবে।
কিন্তু এই ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনেক সময় উপেক্ষা করা হয়। এশিয়ার অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এখনো তাদের পুরোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎব্যবস্থা বদলাতে তেমন আগ্রহী নয়। কারণ তারা বহু দশক ধরে এই কয়লাভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করেছে এবং এগুলো এখনো তুলনামূলকভাবে সস্তায় চালানো যায়।
ফলে নতুন করে আনা প্রতিটি এলএনজি কার্গোকে এমন একটি জ্বালানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে, যাকে অনেক উন্নয়নশীল দেশ খরচ ও নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে বেশি সুবিধাজনক মনে করে। এর ফলে এলএনজি রপ্তানি শিল্পের সামনে একটি কঠিন বাণিজ্যিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। ধনী দেশগুলো হয়তো কম কার্বন নিঃসরণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে নমনীয়তার কারণে গ্যাসকে মূল্য দিতে পারে।
কিন্তু নিম্ন-আয়ের দেশগুলো অনেক সময় সাশ্রয়ী দামকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে একটি অস্বস্তিকর বৈপরীত্য তৈরি হচ্ছে। এলএনজি সরবরাহকারীদের যে বাজারগুলোতে নতুন চাহিদা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই বাজারগুলোতেই এলএনজি সবচেয়ে সহজে প্রতিযোগিতা করতে পারছে না।
এর কোনোটির অর্থ এই নয় যে এলএনজির বৈশ্বিক চাহিদা এখনই ধসে পড়তে যাচ্ছে। বিশ্বের অনেক বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার এখনো বাড়ছে এবং নতুন এলএনজি আমদানি অবকাঠামোও তৈরি হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দিচ্ছে—ভবিষ্যতে এলএনজির চাহিদা বাড়বে, এই ধারণাকে স্বয়ংক্রিয় বা নিশ্চিত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বিশ্বের এলএনজি শিল্প বর্তমানে নতুন রপ্তানি সক্ষমতা তৈরিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। এই বিনিয়োগের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুমান হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিদ্যুৎব্যবস্থা যত বড় হবে, তাদের গ্যাসের ব্যবহারও ধীরে ধীরে বাড়বে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, বাস্তবতা অন্যরকমও হতে পারে। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও কোনো দেশে গ্যাসের ব্যবহার বরং কমতির দিকে যেতে পারে। এখন এলএনজি বিনিয়োগকারীদের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে—বাংলাদেশের মতো আর কতগুলো দেশ ভবিষ্যতে একই পথে হাঁটতে পারে?
তথ্যসূত্র: রয়টার্স