নারী এশিয়ান কাপে প্রথমবারের মতো খেলা বাংলাদেশ থেমেছে গ্রুপ পর্বে। তবে অভিজ্ঞ রুপনা চাকমাকে টপকে মূল একাদশে জায়গা করে নিয়ে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে উজ্জ্বল ছিলেন গোলরক্ষক মিলি আক্তার। চীন, উত্তর কোরিয়া ও উজবেকিস্তানের মতো এশিয়ার শক্তিশালী দলগুলোর একের পর এক আক্রমণ সামলে তিন ম্যাচে রেকর্ড ১৬টি সেভ করেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা এবং সামনের অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টের লক্ষ্য গতকাল আজকের পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেন এই গোলরক্ষক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ার সোহাগ
প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়া থেকে খেলে আসার পর বোধ হয় অবসর পাননি, তাই না?
মিলি আক্তার: ছুটি নেই, আমরা বাড়িতে যাইনি। অনূর্ধ্ব-২০ পর্যায়ের খেলা আছে বলে ঈদের দুই দিন পর যাব। এখন ক্যাম্পেই আছি। মূলত অস্ট্রেলিয়ার সফরের ক্লিয়ারেন্স করতে আজ এসেছিলাম (সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে)। সেখানে আমার পারফরম্যান্স দেখে সেনাবাহিনী থেকে আমাকে ১ লাখ টাকার একটা টিভি উপহার দেওয়া হয়েছে। আগে বলেছিলাম যে আমাদের বাসায় টিভি নেই, সেটা জেনেই সেনাপ্রধান স্যার এটি দিয়েছেন। টিভিটা পরে বাসায় পাঠিয়ে দেব।
প্রশ্ন: চীন, উত্তর কোরিয়া, উজবেকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে দক্ষতার সঙ্গে গোলবার সামলেছেন। এই অভিজ্ঞতা আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই।
মিলি: যখন রুপনা (চাকমা) আপু খেলত, তখন জাতীয় দলে অনেক দিন ছিলাম। অনেকে তখন অনেক কথা বলত যে এত দিন ক্যাম্পে থেকেও খেলতে পারে না, শুধু রুপনাই খেলে। জেদ ছিল নিজেকে প্রমাণ করার। সেই জেদ নিয়েই আমি মাঠে নেমেছিলাম। পিটার বাটলার স্যার যদি না আসতেন, তবে সুযোগটা পেতাম না। তিনি আমাকে লিগ থেকে খুঁজে বের করে ভুটানে একটা ম্যাচ খেলিয়েছিলেন এবং এবার বড় সুযোগ দিলেন। আমি চেয়েছি বাটলার স্যারের আস্থার প্রতিদান দিতে এবং মুখ উজ্জ্বল করতে।
প্রশ্ন: প্রথম যখন শুনলেন যে চীনের বিপক্ষে রুপনার জায়গায় আপনাকে খেলানো হবে, তখন কেমন লেগেছিল?
মিলি: আমি যেদিন এটা শুনি, সেদিন থেকেই নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করছিলাম। বাংলাদেশে ২০১৮ সাল থেকে যে গোলকিপার খেলছে (রুপনা), তাঁকে টপকে আমি সুযোগ পেয়েছি—এটা আসলে আমার কাছে অনেক বড় বিষয়। আমার উচ্চতা এখানে বাড়তি সুবিধা এনে দিয়েছে।
প্রশ্ন: রুপনার সঙ্গে কী কথা হয়েছে টুর্নামেন্টে সুযোগ পাওয়ার পর?
মিলি: তিনি আমাকে বলেছিলেন, শাবাশ, ভালো খেলছিস। আমি তাঁকে সিনিয়র হিসেবে অনেক সম্মান করি। তিনি আমার সামনে হাসিখুশিই ছিলেন, তাঁর মন খারাপ আমি দেখিনি।
প্রশ্ন: এশিয়ান কাপের গ্রুপপর্বে সর্বোচ্চ ১৬টি সেভ করেছেন আপনি। অন্য কোনো গোলরক্ষকের এমন কীর্তি নেই। এ পরিসংখ্যান কতটা অনুপ্রাণিত করে?
মিলি: এটা অনেক বড় একটা পাওয়া। এত বড় মঞ্চে খেলতে পেরে অনেক ভালো লেগেছে। সেখানে খেলে আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে। সামনে আমাদের অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ আছে, সেখানেও এই অভিজ্ঞতা আমাকে সহায়তা করবে। দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে পারাটা সত্যিই গর্বের।
প্রশ্ন: আপনার পরিবার এবং বাবার কথা যদি একটু বলতেন?
মিলি: আমার বাবা অনেক খুশি। আমরা চার বোন, তিন বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ঈদের জন্য ভাগনে-ভাগনি আর দুলাভাইদের জন্য কেনাকাটা করেছি, বাবা-মার জন্য পরে কিনব। আমার বাবা অনেক কষ্ট করে আমাদের বড় করেছেন। আগে তিনি কলার ব্যবসা করতেন, ধান কাটতেন। এখন বয়স হয়েছে, তবু তিনি কাজ ছাড়তে চান না। আমি বারণ করি, বলি যে আমি তো আছিই!
প্রশ্ন: আগে তো মেয়েদের ফুটবল নিয়ে সামাজিকভাবে অনেক বাধা ছিল, আপনার শুরুর দিনগুলো কেমন ছিল?
মিলি: আগে বাসায় খেলতে দিতে চাইত না। মেয়ে হয়ে হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলব—এটা অনেকে ভালোভাবে নিত না। একবার ক্যাম্প থেকে বাদ পড়ে যখন বাসায় ফিরেছিলাম, তখন অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছে। এখন অবশ্য সবাই প্রশংসা করে। ভালো কিছু করলে মানুষ আসবেই, তবে ওসব তো আর ভোলা যায় না।
প্রশ্ন: ফুটবলের হাতেখড়ি বা গোলকিপার হওয়াটা কীভাবে হলো?
মিলি: ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় বঙ্গমাতা ফুটবল দিয়ে শুরু। পরে অনূর্ধ্ব-১৪ খেলার সময় রংপুরের বিপক্ষে একটা পেনাল্টি সেভ দিয়েছিলাম এবং ভালো কিছু সেভ ছিল। সেটা দেখেই ছোটন স্যার আমাকে ক্যাম্পে নিয়ে যান। অনেক চড়াই-উতরাই পার করে শেষ পর্যন্ত অনূর্ধ্ব-২০ সাফে বাটলার স্যারের অধীনে খেলার সুযোগ পাই।
প্রশ্ন: জাতীয় দলের ক্যাম্পে তো অনেক দিন ধরে ছিলেন। এমন ভাবনা কি এসেছিল জাতীয় দলে খেলার সুযোগ আসবে না?
মিলি: সব সময় ভাবতাম সুযোগ আসবে। ২০২৪ সালে সাফ হয়েছিল তখনো ক্যাম্পে ছিলাম, বাদ পড়ছিলাম। অনূর্ধ্ব-১৯ দলেও বাদ পড়ছিলাম। সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। অনূর্ধ্ব-২০ সাফে গত বছর চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, দক্ষিণ এশিয়ান সেরা গোলরক্ষক হয়েছি। এর পর থেকে বদল আসতে শুরু করে।
প্রশ্ন: এবার টুর্নামেন্টে ভিএআর প্রযুক্তি ছিল। এটা নিয়ে আপনাদের প্রথম অভিজ্ঞতা কেমন হলো?
মিলি: ভিএআর থাকার ফলে আমরা কিছু সুবিধা পেয়েছি। তবে আন্তর্জাতিক রেফারিরা অনেক কড়া। আমাদের ঘরোয়া লিগে বল মারতে সময় নেওয়া যায়, কিন্তু সেখানে ৫ সেকেন্ডের বেশি বল ধরে রাখলেই ওয়ার্নিং দেয়। উত্তর কোরিয়া ম্যাচে আমি ব্যথা পেয়ে পড়ে গেলেও রেফারি মনে করেছিলেন আমি অভিনয় করছি!
প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়ার ফুটবল পরিবেশ কেমন দেখলেন?
মিলি: ওদের দেশের ফুটবল পরিবেশ আমাদের চেয়ে অনেক উন্নত। সেখানে যাওয়ার সুযোগ পেলে আমি নিজেকে আরও ভালোভাবে মেলে ধরতে পারতাম এবং আরও বড় বড় ক্লাবে খেলার সুযোগ হতো। আমার স্বপ্ন ইউরোপের কোনো ক্লাবে খেলা; তবে জানি না আল্লাহ আমার এই স্বপ্ন পূরণ করবেন কি না।
প্রশ্ন: উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার সুযোগ ছিল। আফসোস হচ্ছে না?
মিলি: উজবেকিস্তানের কাছে হারার পর অনেক কান্নাকাটি করেছি, পরে ম্যাডাম (সহকারী কোচ) ও স্যার (বাটলার) সান্ত্বনা দিয়েছেন। পায়ে ব্যথা নিয়ে খেলেছি। তবু পারিনি।
প্রশ্ন: থাইল্যান্ডে অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ নিয়ে কতটা আশাবাদী?
মিলি: ইনশা আল্লাহ থাইল্যান্ডে আমরা নিজেদের উজাড় করে খেলব এবং ভালো কিছু করব। আমাকে নিয়ে বেশি প্রত্যাশা থাকবে জানি। আসলে টানা ম্যাচের ওপর থাকায় শরীর এখন বেশ ক্লান্ত, একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। তবে কাল থেকেই আবার অনুশীলন শুরু করব।
প্রশ্ন: এশিয়ান কাপে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে কেমন প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন?
মিলি: সব দেশের কোচই আমার প্রশংসা করছে, অনেক ভালো বলছে সবাই। উজবেকিস্তানের কোচ বলেছেন যে গোলকিপার অনেক ভালো।’ এমনকি চীনের কোচও অবাক হয়ে গেছে যে আমি এত ছোট হয়েও কীভাবে এত ভালো করলাম! আমাদের গ্রুপে যারা ছিল, এমনকি অন্য গ্রুপের কোচ ও ফুটবলাররাও অনেক প্রশংসা করছে। ওদের দেশে খেলার ব্যাপারে সরাসরি কিছু বলেনি। তবে দেখি থাইল্যান্ডে খেলার পর কী হয়।