১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭ মিশনের সমাপ্তির পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর বিরতি ভেঙে আবারও চাঁদের দেশে পাড়ি জমাল মানুষ। গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে নাসার ৩২২ ফুট উচ্চতার দানবীয় ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ (এসএলএস) রকেটটি সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। এই ঐতিহাসিক ‘আর্টেমিস ২’ মিশনের মাধ্যমে চারজন নভোচারী নিয়ে ওরিয়ন ক্যাপসুল এখন পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ ছাড়িয়ে গভীর মহাকাশের দিকে ধাবমান।
উৎক্ষেপণের আগের কয়েক ঘণ্টা ছিল চরম নাটকীয়তায় ঠাসা। প্রকৌশলীদের বেশ কয়েকটি কারিগরি সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়েছে। রকেটে জ্বালানি ভরার সময় হাইড্রোজেন লিক শনাক্ত হয়েছিল। এর আগে একাধিকবার মিশন স্থগিত করা হয়েছিল এই কারণেই। তবে এবার কোনো বড় লিক ধরা পড়েনি। এ ছাড়া শেষ মুহূর্তে ব্যাটারি সেন্সর এবং রকেটের ‘ফ্লাইট টার্মিনেশন সিস্টেম’ (যা রকেট পথ হারালে ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হয়) নিয়ে ত্রুটি দেখা দিলেও তা দ্রুত সমাধান করা হয়। ওরিয়ন ক্যাপসুলটি পৃথিবী ছাড়ার পাঁচ মিনিট পরেই মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান উচ্ছ্বসিত হয়ে কন্ট্রোল রুমে বলেন, ‘আমরা এক সুন্দর চন্দ্রোদয় দেখতে পাচ্ছি। আমরা ঠিক সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।’
মিশনের লক্ষ্য: কেন এই ১০ দিনের সফর?
১০ দিনের এই মিশনে ওরিয়ন মহাকাশযানটি চাঁদে অবতরণ করবে না, বরং চাঁদের চারপাশ দিয়ে একটি ‘ফ্রি-রিটার্ন’ ট্র্যাজেক্টোরি অনুসরণ করবে। এটি এমন একটি কৌশলগত পথ যা বাড়তি জ্বালানি ছাড়াই চাঁদের অভিকর্ষজ শক্তি ব্যবহার করে ক্যাপসুলটিকে পুনরায় পৃথিবীর দিকে ঠেলে দেবে। মিশনের প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো:
ওরিয়ন ক্যাপসুলের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা।
গভীর মহাকাশে নভোচারীদের বিকিরণ থেকে সুরক্ষার মাত্রা যাচাই করা।
মহাকাশযানের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় ’হিট শিল্ড’-এর সক্ষমতা প্রমাণ করা।
সব ঠিক থাকলে ২০২৮ সালে ‘আর্টেমিস ৪’ মিশনের মাধ্যমে আবারও চাঁদের মাটিতে মানুষের পা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে নাসার।
যারা আছেন এই ঐতিহাসিক সফরে
এই মিশনে অংশ নেওয়া চারজন নভোচারীর মধ্যে তিনজন নাসার এবং একজন কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ:
১. রিড ওয়াইজম্যান (কমান্ডার): ৫০ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ নভোচারী এর আগে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পেশায় টেস্ট পাইলট।
২. ভিক্টর গ্লোভার (পাইলট): ৪৯ বছর বয়সী মার্কিন নৌবাহিনীর এই বৈমানিক প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী হিসেবে চাঁদের মিশনে ইতিহাস গড়লেন।
৩. ক্রিস্টিনা কোচ (মিশন স্পেশালিস্ট): ৪৭ বছর বয়সী কোচ নারী হিসেবে মহাকাশে দীর্ঘতম সময় (৩২৮ দিন) কাটানোর বিশ্ব রেকর্ডধারী। মহাকাশে হাঁটার (স্পেস ওয়াক) কাজেও তিনি অত্যন্ত দক্ষ।
৪. জেরেমি হ্যানসেন (মিশন স্পেশালিস্ট): ৫০ বছর বয়সী এই সাবেক ফাইটার জেট পাইলট প্রথম কানাডিয়ান হিসেবে চাঁদের দেশে যাত্রা করলেন, যা মহাকাশ গবেষণায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতীক।
১০ দিনের মহাকাশ যাত্রার বিস্তারিত সূচি
প্রথম ২ দিন (পৃথিবীর উচ্চ কক্ষপথ): নভোচারীরা পৃথিবীর কক্ষপথে থেকে মহাকাশযানের সব সিস্টেম খুঁটিয়ে পরীক্ষা করবেন। এরপর ‘ট্রান্সলুনার ইনজেকশন’ নামক একটি জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওরিয়ন পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চাঁদের পথে রওনা দেবে।
তৃতীয় ও চতুর্থ দিন (ট্রান্সলুনার ট্রানজিট): এ সময় ওরিয়ন মহাকাশের গভীরে থাকবে এবং নভোচারীরা ওরিয়নের মূল সিস্টেমগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।
পঞ্চম দিন (চাঁদের অভিকর্ষ বল): মহাকাশযানটি চাঁদের মহাকর্ষীয় বলের মধ্যে প্রবেশ করবে। নভোচারীরা তাঁদের স্পেসস্যুট পরীক্ষা করবেন এবং সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতির মহড়া দেবেন।
ষষ্ঠ দিন (৬ এপ্রিল - লুনার ফ্লাইবাই): এটি মিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। ওরিয়ন চন্দ্রপৃষ্ঠের মাত্র ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার মাইল ওপর দিয়ে উড়ে যাবে।
সপ্তম-নবম দিন (ফিরতি যাত্রা): চাঁদের অভিকর্ষজ বলের ধাক্কায় ওরিয়ন পৃথিবীর দিকে ফেরার যাত্রা শুরু করবে। এ সময় ‘আর্চার’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে নভোচারীদের শারীরিক অবস্থার ওপর গভীর মহাকাশের প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলবে।
দশম দিন (১০ এপ্রিল): ওরিয়ন সার্ভিস মডিউল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রায় ২৫ হাজার মাইল প্রতি ঘণ্টা বেগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে। এরপর বিশাল প্যারাশুটের সাহায্যে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ (স্প্ল্যাশডাউন) করবে।
নাসার পরবর্তী পদক্ষেপ
আর্টেমিস ২-এর সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে ২০২৭ সালে ‘আর্টেমিস ৩’ মিশন পরিচালিত হবে। সেই মিশনে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্পেসএক্স-এর ‘স্টারশিপ’ বা জেফ বেজোসের মালিকানাধীন ব্লু অরিজিনের ‘ব্লু মুন’ ল্যান্ডারের মাধ্যমে নভোচারীদের সরাসরি চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে।