একটা সমাজে বাস করলে একজনের সঙ্গে আরেকজনের মনোমালিন্য হওয়াটা অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু তার জের ধরে কাউকে হত্যা করা বর্বরতার শামিল। আমরা আদিম সমাজ থেকে সভ্য সমাজে প্রবেশ করেছি। কিন্তু আধুনিককালে এসেও যখন সেই আদিমতার লক্ষণ প্রকাশ পায়, তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই সভ্য হতে পেরেছি?
২৪ ফেব্রুয়ারি আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা নিয়ে নড়াইল সদর উপজেলার শিঙ্গাশোল ইউনিয়নের বড়কুলা
গ্রামের খলিল শেখের সঙ্গে ওসিকুর ফকিরের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল। খলিল শেখ তারাপুর গ্রামের বাসিন্দা হলেও ৯-১০ বছর আগে এসব ঝামেলা এড়াতে পাশের বড়কুলা গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। রেষারেষি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য জায়গার স্থানান্তর করলেও তাঁর জীবন রক্ষা পেল না। প্রতিপক্ষ ওসিকুর ফকিরের লোকজন পূর্বশত্রুতার জের ধরে খলিল শেখের বাড়িতে হামলা করে তাঁকে, তাঁর ছেলে তাহাজ্জত শেখ এবং একই পক্ষের ফেরদাউস হোসেনকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে হত্যা করেন। অন্যদিকে খলিল শেখের পক্ষের লোকের আঘাতে মারা যান ওসিকুর ফকির। এ ঘটনায় দুই পক্ষের পাঁচ-ছয়জন আহত হন। এ ছাড়া সংঘর্ষের পর পাঁচ-ছয়টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে।
আমাদের দেশে একসময় সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থায় আধিপত্য বিস্তার, বংশের কৌলীন্যতার গৌরব নিয়ে নানা ধরনের হত্যা ও মারামারির ঘটনা ঘটত। কৃষি ব্যবস্থায় উৎপাদন সম্পর্কের ব্যাপক রূপান্তরের মাধ্যমে সেই সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থার আর অস্তিত্ব নেই। কিন্তু সেই সমাজের রেষ থাকার কারণে এই ঘটনাগুলো ঘটছে।
একটা সময় গ্রামের এ ধরনের ঘটনার সমাধান হতো গ্রাম্য মাতব্বরদের সালিস মীমাংসা করার মধ্য দিয়ে। এরপর স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়নের কারণে সেটা ইউপি চেয়ারম্যানরা মীমাংসা করতেন। সেখানে সমাধান না হলে সেটা থানা অথবা আদালত পর্যন্ত গড়াত। এখনো অনেক ক্ষেত্রে গ্রাম্য প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের প্রভাব জিইয়ে রাখতে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। সমাজব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তনের পরেও শুধু আধিপত্যের কারণে যে এ রকম ঘটনাগুলো ঘটছে, তা সহজে অনুমেয়।
বংশীয় গৌরব এবং আধিপত্যের অহংকার থেকে মুক্ত না হলে ব্যক্তির পরিবর্তন কোনোভাবে সম্ভব নয়। আর যদি ব্যক্তির পরিবর্তন না হয়, তাহলে সমাজের পরিবর্তন হবে কী করে? তাই এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তা প্রতিরোধ করার জন্য প্রচলিত আইনের মাধ্যমে বিচার করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারব্যবস্থার জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় ভূমিকা রাখা জরুরি।
আধুনিক প্রযুক্তির এই সময়ে শুধু আধিপত্যের লোভে এভাবে মানুষের প্রাণ যেতে পারে না। নড়াইলের এই চার হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে শুধু এ ধরনের হত্যার ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে প্রশাসন যদি এখনই কঠোর না হয়, তাহলে এই রক্তের খেলা চলতেই থাকবে। গ্রাম্য সমাজব্যবস্থার স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং সেখানকার সুশাসন ফিরিয়ে আনার জন্যই তা করতে হবে। না হলে অন্য কোনো অঞ্চলেও আধিপত্যবাদের ভূত সংক্রমিত হতে পারে।