বাংলাদেশ পুলিশে প্রথমবারের মতো সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে চার হাজার উপপরিদর্শক (এসআই-নিরস্ত্র) পদ পূরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে ৫০০টি সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদ সৃষ্টির পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশ পুলিশকে যুগোপযোগী ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বড় ধরনের জনবল পুনর্গঠনের উদ্যোগের অংশ হলো এই পরিকল্পনা। তবে এই উদ্যোগ ঘিরে পুলিশ বাহিনীর নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের অনেকে আশঙ্কা করছেন, সরাসরি এসআই নিয়োগের ফলে পদোন্নতির স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হতে পারে। এতে তাঁদের চাকরিজীবনে উন্নতিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরে ৬ এপ্রিল পলিসি গ্রুপের বৈঠকে এই পরিকল্পনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অতিরিক্ত আইজিপিরা (এসবি, পিবিআই, সিআইডি), র্যাবের মহাপরিচালক, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনারসহ অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক, দক্ষ ও জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে জনবল বৃদ্ধি, কাঠামোগত সংস্কার এবং প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় ৪ হাজার এসআই পদ সৃজন করে সেগুলো সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিদ্যমান পুলিশ রেগুলেশনস (পিআরবি), ১৯৪৩-এর প্রবিধান অনুযায়ী সরাসরি এসআই নিয়োগে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকায় সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ লক্ষ্যে বৈঠকের পরপরই পুলিশ সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স শাখা থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, পুলিশের এসআই পদের ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে এবং বাকি ৫০ শতাংশ বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। তবে প্রস্তাবিত সংশোধনে বিভাগীয় কোটা সংকুচিত বা বিলুপ্ত করে সরাসরি নিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলে কনস্টেবল, নায়েক ও এএসআই পদমর্যাদার দেড় লক্ষাধিক সদস্যের চাকরিজীবনে উন্নতি নিয়ে সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন এবং ফৌজদারি মামলার তদন্তের মূল দায়িত্ব পুলিশের ওপর ন্যস্ত থাকলেও বর্তমান বাস্তবতায় অপরাধের ধরন ও মাত্রা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সাইবার অপরাধ, সংগঠিত অপরাধ, উগ্রবাদ, মাদক কারবারি চক্রসহ বিভিন্ন অপরাধ জটিল আকার ধারণ করেছে। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হ্যাকিং, সাইবার বুলিং থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁসের মতো ঘটনাগুলো জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
পুলিশের প্রস্তাবে আরও উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে সাইবার অপরাধ তদন্তে পুলিশের কিছু ইউনিট কাজ করলেও তা সীমিত এবং কেন্দ্রভিত্তিক। ফলে রাজধানীর বাইরে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের জনগণ অনেক ক্ষেত্রেই এই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে অনলাইনে জিডি ও মামলা গ্রহণ, তদন্ত কার্যক্রম, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ও অপারেশনাল দায়িত্ব পালনে দক্ষ জনবলের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এসব বাস্তবতায় আধুনিক, পেশাদার ও দক্ষ পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে এসআই পদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছে পুলিশ সদর দপ্তর। এ জন্য বিদ্যমান নিয়োগবিধি সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স শাখার অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান বলেন, এসআই নিয়োগের বিদ্যমান বিধিমালা সংশোধনের জন্য একটি খসড়া মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সরকার অনুমোদন দিলে সরাসরি নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে।
তবে এ উদ্যোগকে ঘিরে পুলিশ বাহিনীর নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে কিছু উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা বলছেন, বর্তমানে বিপুলসংখ্যক কনস্টেবল ও এএসআই পদোন্নতির মাধ্যমে এসআই হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। ইতিমধ্যে ৯৪৬ জন সদস্য এসআই পদে পদোন্নতির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। সরাসরি বিপুলসংখ্যক এসআই নিয়োগ হলে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের এক এএসআই বলেন, পদোন্নতির মাধ্যমে যাঁরা এসআই হওয়ার জন্য দীর্ঘদিন প্রস্তুতি নিয়েছেন, তাঁদের স্বার্থও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তাঁদের পদোন্নতি নিশ্চিত করে অতিরিক্ত নিয়োগ দিলে এ নিয়ে উদ্বেগ, আশঙ্কা কমবে।
তবে পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্রগুলো বলছে, পিআরবি সংশোধনের মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও তদবিরের প্রবণতা কমবে।
সূত্র বলেছে, ৬ এপ্রিলের পলিসি গ্রুপের বৈঠকেই পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করতে ৫০০টি এএসপি পদ সৃষ্টির প্রস্তাবও উত্থাপন করা হয়। আলোচনায় উঠে আসে, ২০২৬-২০৩০ সালের মধ্যে বিপুলসংখ্যক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অবসরে যাবেন। পাশাপাশি বর্তমানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পদ শূন্য রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মধ্যম পর্যায়ের নেতৃত্ব শক্তিশালী করতে নতুন এএসপি পদ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
বৈঠকে বিভিন্ন ইউনিটে ‘এএসপি ক্রাইম অ্যান্ড অপস’, ‘এএসপি ডিবি’ এবং ‘এএসপি প্রসিকিউশন’ পদ সৃষ্টির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা ও অপরাধ দমনে এসব পদ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মত দেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলেন, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োগ দিলে ভবিষ্যতে পদোন্নতিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় চাকরিতে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি পাচ্ছেন না।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, এএসপি পদ সৃষ্টির বিষয়ে বিস্তারিত প্রস্তাব তৈরির জন্য একটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কমিটি কর্মকর্তাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেবে। এরপর তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তবে বৈঠকে উপস্থিত অধিকাংশ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পলিসি গ্রুপের আলোচনা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।