গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নে বাংলাদেশ ‘জাতীয় স্বার্থ’ রক্ষার নীতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মেয়াদ দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। এমন সময়ে এ কথা বলেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে হুমায়ুন কবির ভারতকে ‘অতীত থেকে বেরিয়ে আসার’ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভারতে সাম্প্রদায়িক ঘটনার বিষয়গুলো বাংলাদেশের জন্য ‘উদ্বেগের’ কারণ।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে সম্পাদিত গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে। বিএনপি সরকার গঠনের পর চুক্তি নবায়নের বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার প্রথম দিকের একটি ইস্যু হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অতীতে বাংলাদেশকে প্রায়ই বলা হয়েছে, নদীসংক্রান্ত চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় রাজ্যগুলোর স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে তারেক রহমানের আসন্ন সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমরা এমনভাবে এগোবো, যাতে তা আমাদের জাতীয় স্বার্থ পূরণ করে।’
হুমায়ুন কবির বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ বদলে গেছে। তাই ‘রাজনীতি আর আগের মতো চলতে পারে না’। তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক পক্ষ একসঙ্গে আসবে। তাঁর ভাষায়, ‘গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, মতভেদ থাকলেও জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে আমরা সবাই এক হতে পারি।’
হুমায়ুন কবির সীমান্তের ওপারে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভারতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা (বাংলাদেশের জন্য) উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশের মানুষ মনে করছে, ভারত ক্রমে অসহিষ্ণু সমাজে পরিণত হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক কট্টর ডানপন্থী ব্যক্তি তীব্র সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিয়ে নির্বাচনে জয়ী হচ্ছেন। তিনি এ প্রবণতাকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে হুমায়ুন কবির বলেন, জামায়াত চরমপন্থী বক্তব্যের আশ্রয় নেওয়ায় ক্ষমতায় আসতে পারেনি। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের বক্তব্য বাংলাদেশে কখনোই নির্বাচনী বিজয় এনে দিতে পারে না। কিন্তু ভারতে মানুষ এ ধরনের বক্তব্যের পক্ষেই ভোট দিচ্ছে। তিনি বলেন, একসময় ভারত একধরনের বহুত্ববাদী দেশ ছিল। বর্তমান প্রবণতা ভারতের জন্য ভালো নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, এসব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা যাবে।’
হুমায়ুন কবির আরও বলেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে বাংলাদেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনাও একটি সমস্যা। ভারতের মতে, এসব ঘটনা আইন প্রয়োগের অংশ। বাংলাদেশি চোরাকারবারি ও অপরাধীরা সীমান্ত পেরিয়ে গোলযোগ সৃষ্টি করতে গেলে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে হুমায়ুন কবির বলেন, এসব ঘটনা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিএনপি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অভিনন্দনবার্তা পাঠান। হুমায়ুন কবির এর প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ‘আঞ্চলিক নেতাদের’ আমন্ত্রণ জানাবে।
তবে তিনি নয়াদিল্লিকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা স্বীকার করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, অতীত থেকে পরিষ্কারভাবে নতুন শুরু করতে পারব। ভারতকে বুঝতে হবে, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ আজকের বাংলাদেশে আর নেই। আমাদের জোরালো বিজয় সেটাই দেখিয়েছে।’
হুমায়ুন কবির বলেন, লন্ডনে নির্বাসিত থাকার সময় তারেক রহমান আন্তর্জাতিক যোগাযোগ গড়ে তুলেছেন। ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজধানী সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী মনোনীত নেতাসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করেছেন।