হোম > Mobile Apps

তিন নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেদন: পরিকল্পনা করেই রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দিয়েছিল ইসি

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

ছবি: আজকের পত্রিকা

বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পনায় গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি থেকে লোক এনে বিএনএম গঠনের চিন্তা করা হয়েছিল। সরকারের ওই পরিকল্পনায় নির্বাচন কমিশনও (ইসি) অংশ হয়, যাতে প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ হয়।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত তিনটি সংসদ নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিশনের ৩২৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন গত বুধবার প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। এর আগে সোমবার প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেন কমিশনের সদস্যরা। পাঁচ সদস্যের এই কমিশনের সভাপতি হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন, সাবেক অতিরিক্ত সচিব শামীম আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুপণ, আইনজীবী তাজরিয়ান আকরাম হোসেন ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীম। ওই তিন নির্বাচনের অনিয়ম তদন্তে গত বছরের জুনে একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে সেটিকে কমিশনে রূপান্তর করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসির নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৯৩টি দল আবেদন করে। প্রাথমিক বাছাই শেষে ১২টি দলের মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাই করেছিল ইসি। সেগুলো হলো এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, নাগরিক ঐক্য, বিএনএম, বিএসপি, বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ সনাতন পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি), বাংলাদেশ পিপলস পার্টি (বিপিপি), ডেমোক্রেটিক পার্টি বাংলাদেশ-এলডিপি। বিএনএম ও বিএসপিকে প্রাথমিক তালিকায় রাখার পর রাজনীতিতে আলোচনায় আসে। বিএনএমের তৎকালীন আহ্বায়ক ছিলেন বিএনপির সাবেক এমপি আবদুর রহমান, সদস্যসচিব বিএনপির সাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য মেজর (অব.) হানিফ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিশেষ সংস্থার প্রভাবে বিগত তিন নির্বাচনের আগে একাধিক দলকে নিবন্ধন দেওয়া হয়। যেগুলো রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮-এর নিবন্ধন শর্ত পূরণ করতে পারেনি। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০২২ সালে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের কার্যক্রম শুরু করেছিল ইসি। ইসির পক্ষ থেকে ওই বছরের ২৯ আগস্টের মধ্যে আবেদন করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) এবং বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত আবেদনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে ইসি ১২টি দলের বিষয়ে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে। এর মধ্যে গণঅধিকার পরিষদ ও এবি পার্টির প্রাথমিক তদন্তে কিছু তথ্য সঠিক থাকলেও পুনর্যাচাইয়ে তথ্য সঠিক না থাকার অভিযোগ এনে দল দুটিকে নিবন্ধন দেওয়া হয়নি। প্রাথমিক যাচাইয়ে তথ্য না থাকলেও পুনর্যাচাইয়ে তথ্য সঠিক দাবি করে বিএনএম ও বিএসপিকে নিবন্ধন দেওয়া হয়। বিষয়টি হাস্যকর ও অগ্রহণযোগ্য। আদালতের নির্দেশে ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ জাসদকে নিবন্ধন করা হয়।

বিএসপির আবেদনে ২৫টি জেলা এবং ১১২টি উপজেলা/থানায় কমিটি আছে বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ইসির নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৭৮টিতে উপজেলা/থানা কার্যালয় কার্যকর না হওয়া সত্ত্বেও সেগুলোকে কার্যকর দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া দলটির চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ মাইজভান্ডারীর ভাই ও বোনের অভিযোগে বলা হয়েছে, পৈতৃক সম্পত্তিকে বিএসপির কেন্দ্রীয় ও জেলা/উপজেলা কার্যালয় দেখানো হয়েছে। আবার কিছু এলাকায় মাইজভান্ডারী দরবারের খানকা তথা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু কমিশন অধিকতর তদন্ত না করেই দলটিকে নিবন্ধন দিয়েছিল।

বিএনএমের কেন্দ্রীয় অফিস ছাড়াও ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলা অফিসের কথা বলা হয়। কিন্তু ইসির প্রাথমিক তদন্তে বেশ কয়েকটি জেলা ও ৮৬টি উপজেলার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি; যা ২০২৩ সালের ১৯ জুন কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হয়। এরপর কমিশন আবারও পুনর্যাচাই করে ২২ জেলা এবং ১০১টি উপজেলার তথ্য সঠিক বলে প্রতিবেদন দেয়। ওই বছরের ১০ আগস্ট বিএনএমকে নিবন্ধন দেওয়া হয়।

২০১৪ সালে নিবন্ধন পাওয়া বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের আবেদনে ৩৪টি জেলা ও ১১১টি উপজেলা/থানায় দলের কার্যকারিতা ও অস্তিত্ব থাকার কথা বলা হয়। কিন্তু ইসির যাচাইয়ে দেখা যায়, ৩০ জেলার দপ্তরের অস্তিত্ব ও কার্যকারিতা পাওয়া যায়, ৩টির অস্তিত্ব থাকলেও কার্যকারিতা ছিল না। বাকি একটির অস্তিত্ব ছিল না। ১১১টি উপজেলা/থানা কমিটির মধ্যে ৭৭টির অস্তিত্ব ও কার্যকারিতা পাওয়া যায়। একইভাবে নিবন্ধনের শর্তপূরণ না হওয়ার পরও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টকে (বিএনএফ) নিবন্ধন দিয়েছিল ইসি। দলটির বিষয়ে বলা হয়, প্রতিষ্ঠাতা নাজমুল হুদা ও বিএনপির বিরোধিতা শর্তেও বিএনএফকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসির নথি পর্যালোচনা করে প্রতীয়মান হয়, ‘বিএনএফকে নিবন্ধন দিতে হবে’—কমিশন এ রকম সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল এবং এ সিদ্ধান্তে কমিশনের ওপর তৎকালীন সরকারের চাপ ছিল। দলটি ১০ম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ঢাকা-১৭ আসনে দলটির চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ জাতীয় পার্টির তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে পরাজিত করে এমপি হয়েছিলেন। যদিও নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আবেদন করেছিলেন এরশাদ। কিন্তু সেটি তৎকালীন ইসি আমলে নেয়নি। আবার এরশাদও প্রচার করেননি। অনেকটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই এমপি হয়েছিলেন আজাদ।

সংসদীয় আসনের সীমানা পরিবর্তনের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে একটি দলকে জিতিয়ে আনার জন্য তৎকালীন বিদায়ী (বিএনপি-জামায়াত) রাজনৈতিক দলের ভোটার-অধ্যুষিত এলাকাকে তছনছ করা হয়। টার্গেট করে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৩৩টি আসনের সীমানা পরিবর্তন করা হয়; যার প্রতিফলন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দলের আসন ও প্রাপ্ত ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দলের আসন ও প্রাপ্ত ভোটে দেখা যায়।

৪৭০ এজেন্সিতে একজনও হজের নিবন্ধন করেননি