শিউলি ফুটছে চারদিকে। কোথাও কোথাও দেখা যাচ্ছে কাশের বন। নীল আকাশ যদিও কালো মেঘে ঢাকা, তারপরও বোঝা যাচ্ছে সময়টা শরৎকাল। আবহাওয়া বেশ মনোরম বটে। কিন্তু করোনা, ডেঙ্গু, জ্যাম আর আফগানিস্তান মিলিয়ে মাঝে মাঝেই বেতাল হয়ে উঠছে সময়। ঠিক যেন দীর্ঘ লয়ের বৈতালিক গান।
ঘটি না ডুবলেও পুকুরের নাম কেন তালপুকুর কিংবা তালগাছ কেন এক পায়েই দাঁড়িয়ে থাকে–জীবনের সঙ্গে এসবের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া না গেলেও, তাল বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ‘তাল’ না থাকলে যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গায়, যে কারও কণ্ঠে ‘তালকানা’ শব্দটি শুনতে হতে পারে। আর সেটি যে আপনার মনঃপূত হবে না, সে বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। সে জন্যই বোধ করি, এই বেতাল সময়ে উপস্থিত হয়েছে তাল নামের ফলটি।
এটাও শুনি, কাঁঠালের আমসত্ত্বের মতো তালসত্ত্বও খাওয়া যায়। তা কত কিছুই তো খাওয়া যায়। জিবে আরাম লাগলে নিমতালের সন্দেশ খেতে রাজি আছি।
বর্ষার শেষ। নিস্তরঙ্গ বিলের জলে শাপলার ওপর যখন ফড়িং খেলা করে, তখন শুরু হয় লিলুয়া বাতাস। হু হু করে বওয়া সে বাতাস ভাদ্রের প্রচণ্ড গরমে স্বস্তি দেয়। আর দেয় ‘তাল কুড়ানি’ সুখ। শরতের এ লিলুয়া বাতাসে ধুপধাপ খসে পড়ে পাকা তাল। হুটোপুটি করে সে তাল দখলে নেওয়া শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হয়ে আছে অনেকের জীবনে। এরপর সে তাল বাড়িতে আনা, এক-আধ দিন রেখে বাঁশের চালনিতে ঘষে ঘষে ক্বাথ ও আঁশ আলাদা করা, তারপর তালের বড়া কিংবা ক্ষীর বানিয়ে খাওয়া! পাকা তালের ক্বাথ বা ঘন রস দুধে জ্বাল দিতে দিতে আরও ঘন হয়ে ওঠার পথে চিনির সঙ্গে মিশে যে সুগন্ধ ছড়ায়, সেটা স্রেফ স্বর্গের জিনিস। বেশি খেলে মাথা কিছুটা ঝিমঝিম করে বটে; কিন্তু না খেলে জিবে অনেক কিছুই অধরা থেকে যায়। এর সঙ্গে সামান্য পরিমাণে সুগন্ধি চাল কিংবা নারকেল কোরা মিশিয়ে পায়েস বানিয়ে ফেললেই বলা যায়–কেল্লাফতে। অবশ্য গুঁড়ো দুধের ছানায় বানানো রসগোল্লা খেয়ে অভ্যস্ত বাঙালি সে স্বাদ কতটা অনুভব করবে এখন, সেটা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হতে পারে।
তবলার সঙ্গে গিটার আর সিন্থেসাইজার মিলিয়ে বাঙালি যে অদ্ভুত ফিউশন মিউজিক বানিয়েছে, তার চেয়ে বেঙ্গলি তাল আর বিদেশিনী বেকিংয়ের মেলবন্ধন ঢের ভালো। এই দুয়ের ভালোবাসাবাসিতে জন্মেছে কেক। তালকেক। খেতেও দারুণ। চাইলে কাপকেকও বানানো যায়। চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবশ্য দেশি কেক খাওয়া হয় অনেক আগে থেকেই। চালের গুঁড়োর সঙ্গে পাকা তালের রস মিশিয়ে কাঁঠাল বা কলাপাতায় কোন আইসক্রিমের মতো আকৃতিতে ভাপে বানানো হয় সে কেক। তার নাম তালের পিঠা।
বহুত হলো তালবন্দনা। গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে বেতাল হয়ে খেয়ে নিন তালের পিঠা কিংবা তালক্ষীর অথবা যা আপনার ভালো লাগে।