লাক্সারি ভ্রমণে তো বটেই, নারীরা এখন একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছেন কঠিন কঠিন সব পাহাড়ি ট্রেক। ঘুরে বেড়াচ্ছেন দিগন্তবিস্তৃত মরুভূমি কিংবা শ্বাপদসংকুল বন। অবলীলায় উঠে পড়ছেন বিভিন্ন পাহাড়ের চূড়ায়, ডুব দিচ্ছেন সাগরতলে। মোটকথা, নারীরা এখন রোমাঞ্চকর ইভেন্টে অ্যাড্রেনালিন রাশ উপভোগ করছেন দারুণভাবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে তো বটেই, আমাদের দেশের নারীরাও এখন পিছিয়ে থাকছে না। এই পিছিয়ে না-থাকা নারীদের মধ্য অন্যতম শাহেলা সাবরিনা শফিক।
শাহেলা একাধারে একজন চিকিৎসক, দুই সন্তানের জননী, একজন পর্যটক এবং একজন সফল স্কুবা ডাইভার। এখন পর্যন্ত তিনি বিশ্বের ৩৫টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। শাহেলার স্বামী জহির ইসলাম। তিনিও একজন স্কুবা ডাইভার ও ভ্রমণপ্রেমী। মূলত তাঁর অনুপ্রেরণায় শাহেলা স্কুবা ডাইভিংয়ের জগতে আসেন।
শাহেলা জেড এইচ সিকদার মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করে লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনে ইমিউনোলজি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিচ্ছেন।
জহিরের ডাইভিং দেখে শাহেলার সাধ জেগেছিল সাগরতলের বিস্ময়কর জগতে বিচরণের। অথচ, তিনি সাঁতার জানেন না! তবু স্বপ্ন থেমে থাকেনি। বাসার কাছের একটি সুইমিংপুলে শিখে নিলেন সাঁতার। এরপর মিসরের বিখ্যাত এম্পেরর ডাইভিং স্কুল থেকে তিনি পিএডিআই ওপেন ওয়াটার সার্টিফিকেশন বাগিয়ে ফেললেন। ২০২৫ সালে তিনি সফলভাবে অ্যাডভান্স ওপেন ওয়াটার সার্টিফিকেশন শেষ করেন। একসময় যে নারী সাঁতার জানতেন না, এখন তিনি সাগরতলের বিচিত্র জগতের স্বাদ নিতে পারেন ইচ্ছা হলেই।
যেকোনো প্রথম কাজ রোমাঞ্চে ভরপুর থাকে। শাহেলার জীবনের প্রথম ডাইভও তার ব্যতিক্রম ছিল না। সে ডাইভেই তাঁর দেখা হয়ে গিয়েছিল
এক বিরল হকসবিল টার্টেলের সঙ্গে। এ ছাড়া সার্ক, ইল এবং নানা রঙের সামুদ্রিক মাছ খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল প্রথমবারেই। এখন স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে ডাইভ করেন। মিসরের রেড সির বিভিন্ন ডাইভ সাইটে তাঁরা একসঙ্গে ডাইভিং করেছেন।
প্রতিটি ডাইভেই শাহেলা নতুন কিছু আবিষ্কার করেন। গভীর নীল পানিতে নামলেই তাঁর মনে হয়, আজ আবার নতুন কিছুর দেখা মিলবে। গত বছরের জুলাই মাসে মিসরে ডাইভিংয়ের সময় তিনি এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। ডাইভের পর হঠাৎ মনে হলো, তিনি দল থেকে আলাদা হয়ে গেছেন। চারপাশ নিঃশব্দ, কেউ নেই। কয়েক মুহূর্তের ভয় তাঁকে গ্রাস করে নিল। ঠিক তখনই পেছন থেকে জহির এসে শক্ত করে হাত ধরে ফেললেন। পরিচিত সেই স্পর্শে তাঁর চোখে পানি চলে আসে। স্বস্তি, নিরাপত্তা আর আনন্দ একসঙ্গে মিশে যায়। মুহূর্তটি আজও তাঁর স্মৃতিতে গভীরভাবে আঁকা।
ভ্রমণের প্রতি শাহেলার আগ্রহ ছোটবেলা থেকে। বাবা-মায়ের সঙ্গে ইউরোপে থাকার সুবাদে তিনি ছোট বয়সেই নানান দেশ দেখার সুযোগ পান। ভ্রমণপ্রেমী জহিরের সঙ্গে বিয়ের পর সেই যাত্রা আরও বিস্তৃত হয়। এখন পর্যন্ত তাঁরা একসঙ্গে ৩৫টি দেশ ঘুরেছেন।
শাহেলার প্রিয় গন্তব্যের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে মালদ্বীপ ও দুবাই। দুবাইয়ের আধুনিকতা, ঝলমলে পরিবেশ এবং শিশুদের জন্য অসংখ্য কার্যক্রম তাঁকে মুগ্ধ করেছে। অন্যদিকে মালদ্বীপের নীরবতা, শান্ত প্রকৃতি ও নির্জনতা তাঁকে দিয়েছে গভীর প্রশান্তি। তুরস্ক তাঁর কাছে এতই প্রিয় যে তিনি সেখানে পাঁচবার গিয়েছেন। এ ছাড়া বসনিয়া, সুইজারল্যান্ড, নর্থ মেসিডোনিয়া ও অস্ট্রিয়া তাঁকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছে।
বিশ্বের বহু দেশ ঘুরে দেখলেও শাহেলার কাছে নিজের দেশের সৌন্দর্য সবচেয়ে প্রিয়। দেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ও সুন্দরবন তাঁর বিশেষ ভালো লাগার জায়গা। দেশের অনেক দর্শনীয় স্থান তিনি ঘুরেছেন; কোথাও খারাপ লেগেছে এমন অভিজ্ঞতা নেই। প্রতিটি ভ্রমণই তাঁকে দিয়েছে নতুন মুগ্ধতা।
শাহেলা সাবরিনার স্বপ্ন, স্বামী জহিরকে সঙ্গে নিয়ে যতটা সম্ভব পৃথিবী ঘুরে দেখা। নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি আর নতুন অভিজ্ঞতার মধ্যে তাঁরা জীবনের আনন্দ খুঁজে পান। শাহেলার কাছে ভ্রমণ করা মানে শুধু বিনোদন নয়; আত্মার তৃপ্তি, নিজের সীমা ছাড়িয়ে পৃথিবীকে কাছ থেকে দেখার এক গভীর অনুপ্রেরণা।