কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন বহুল ব্যবহৃত। অফিস থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষ—সবখানেই এর বিচরণ অবাধে। তবে এর অপব্যবহার শিক্ষার্থীদের বিকাশ ও সৃজনশীলতাকে নেতিবাচক দিকে ধাবিত করছে। এর ক্রমবর্ধমান অপব্যবহার রুখতে এবং শিক্ষার্থীরা সত্যিই বিষয়টি বুঝতে পারছে কি না, তা যাচাই করতে উত্তর আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফিরে আসছে সনাতন পদ্ধতির দিকে। তারা মৌখিক পরীক্ষার দিকে আগ্রহী হয়ে উঠছে আবারও। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও শিক্ষকদের অভিজ্ঞতার আলোকে এ পরিবর্তনের চিত্রটি স্পষ্ট।
এআই বনাম প্রকৃত মেধা
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ডেটা সায়েন্সের অধ্যাপক প্যানোস ইপিরোটিস একটি বিষয় উল্লেখ্য করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্টগুলো দেখতে বেশ ঝরঝরে ও নিখুঁত। তবে ক্লাসে যখন তাদের সে কাজ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, তখন তারা হিমশিম খাচ্ছে। অর্থাৎ, এআইয়ের মাধ্যমে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়ে তারা মূল বিষয়টি না শিখেই পার পেয়ে যাচ্ছিল। ইউনিভার্সিটি অব ওয়াইওমিংয়ের অধ্যাপক ক্যাথরিন হার্টম্যান জানান, এআইয়ের নকল ধরতে গিয়ে নিজেকে শিক্ষক নয়; বরং একজন ‘ডিটেকটিভ’ মনে হতো তাঁর। এ তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই অনেক অধ্যাপক প্রবন্ধ বা মাল্টিপল চয়েস টেস্টের বদলে মুখোমুখি আলোচনার দিকে ঝুঁকছেন।
প্রযুক্তির বিরুদ্ধে প্রযুক্তি
মৌখিক পরীক্ষা অত্যন্ত কার্যকর হলেও বড় ক্লাসে সবার পরীক্ষা নেওয়া শিক্ষকদের জন্য সময়ের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ সেখানে থাকে অনেক শিক্ষার্থী। তাদের সিলেবাসও অনেক বড়। এ সমস্যা সমাধানে অধ্যাপক ইপিরোটিস ‘আগুনের বিরুদ্ধে আগুন’ দিয়ে লড়াই করার পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেই ব্যবহার করেছেন পরীক্ষক হিসেবে। ইলাভেনল্যাবসের প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি একটি এআই এজেন্ট তৈরি করেছেন। এই প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের প্রজেক্ট সম্পর্কে প্রশ্ন করে এবং রিয়েল টাইমে তাদের দক্ষতা যাচাই করে। মজার বিষয় হলো, শিক্ষার্থীদের গ্রেড দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি তিনটি আলাদা এআই মডেল ব্যবহার করেছেন, যা মানুষের তুলনায় অনেক বেশি ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ ফলাফল দিয়েছে।
উত্তর আমেরিকাজুড়ে পরিবর্তনের ঢেউ
ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মার্ক চিন তাঁর ডেটা সায়েন্স কোর্সে শিক্ষার্থীদের সরাসরি কোড ব্যাখ্যা করতে বলেন। যদিও এতে শিক্ষার্থীরা কিছুটা উদ্বিগ্ন থাকে। তবে তারা নিজের চিন্তাভাবনা সরাসরি প্রকাশ করার সুযোগ পেয়ে খুশি। অন্যদিকে, কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ৬০০ শিক্ষার্থীর বড় ক্লাসেও মৌখিক পরীক্ষা পদ্ধতি সফলভাবে প্রয়োগ করেছে। এভাবেই তাঁরা মেধা যাচাইয়ের জন্য লড়ে যাচ্ছেন। কারণ এআই শিক্ষার্থীদের কাছে কাজ সহজ করলেও তাদের দক্ষতা কমিয়ে দিচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ
ইউনিভার্সিটি লেভেলে মৌখিক পরীক্ষার সুফল থাকলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আইভি বিজনেস স্কুলের গবেষক কাইল ম্যাকলিন জানান, এ পদ্ধতি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ চাপযুক্ত। যেহেতু এখানে তাৎক্ষণিক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। তাই শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের রিহার্সাল ছাড়াই কথা বলতে বাধ্য হয়, যা তাদের ওপর মানসিক চাপ বাড়ায়। তবে লিংকডইনের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যানের মতে, এআইসমৃদ্ধ পৃথিবীতে মৌখিক পরীক্ষাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। তিনি মনে করেন, এআইকে শিক্ষা থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়; বরং একে শিক্ষার কাজে ব্যবহার করতে হবে। শিক্ষার্থীদের একটি সক্ষম ও সুস্থ ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এআইয়ের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা এখন অপরিহার্য।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন ছোট ক্লাস, প্রজেক্টভিত্তিক লার্নিং এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গভীর সংলাপের দিকে এগোচ্ছে। এআইয়ের যুগে কেবল তথ্য মুখস্থ রাখা নয়; বরং সে তথ্য বিশ্লেষণ ও রিয়েল টাইম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই হবে আগামীর আসল মাপকাঠি।
সূত্র: ভিএন এক্সপ্রেস