পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে গত চার দিনে পৃথক তিনটি হামলায় চারজন বেসামরিক নাগরিক এবং পুলিশ ও সেনাসদস্যসহ মোট ৪২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গতকাল বুধবার (৮ জুলাই) এক দিনেই ১৮ জন অপহৃত পুলিশ কর্মকর্তা এবং ১১ জন সেনাসদস্যকে হত্যা করেছে সশস্ত্র বিদ্রোহীরা। তবে সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযানে ইতিমধ্যে ৫৪ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী গতকাল বুধবার রাওয়ালপিন্ডিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গত চার দিন ধরে বেলুচিস্তানের বিভিন্ন অংশে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা একের পর এক এই হামলাগুলো চালায়। গত সোমবার রাতে প্রদেশের জিয়ারত জেলায় কয়েক ডজন সশস্ত্র সন্ত্রাসী একটি পুলিশ পোস্টে অতর্কিত হামলা চালিয়ে প্রথমে নয়জন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করে এবং ১৮ জন পুলিশ সদস্যকে তুলে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে গতকাল বুধবার সেই অপহৃত ১৮ জন পুলিশ কর্মকর্তাকেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
এর পাশাপাশি গতকাল লাসবেলা জেলায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা একটি মহাসড়ক অবরোধ করে। নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীর একটি গাড়িবহর লক্ষ্য করে হামলা চালালে ১১ জন সেনাসদস্য ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ওই অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা গুলিতে ১৯ জন সন্ত্রাসীও নিহত হয়েছে। সব মিলিয়ে গত চার দিনে চারজন বেসামরিক নাগরিকসহ মোট ৪২ জন নিহত এবং সেনাবাহিনীর অভিযানে ৫৪ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এই বিশেষ ভাষণে মুখপাত্র আহমেদ শরিফ চৌধুরী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমরা সন্ত্রাসীদের যেখানেই পাব, সেখান থেকেই তাদের খুঁজে বের করে চরম আঘাত করব এবং এই সামরিক অভিযান আরও জোরদার করা হবে।’
পাকিস্তান সরকার ও সামরিক বাহিনীর দাবি, নিষিদ্ধ ঘোষিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) ভারতের মদদে এই সুপরিকল্পিত হামলাগুলো চালিয়েছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে এই ধরনের অভিযোগ বরাবরের মতোই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর কিন্তু অনুন্নত বেলুচিস্তান প্রদেশে গত কয়েক বছর ধরেই স্থানীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও আফগানিস্তান-ইরান সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় বিদেশি বিনিয়োগে তৈরি প্রকল্প লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে মাঙ্গি বাঁধ প্রকল্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা চৌকিগুলোতে সশস্ত্র ব্যক্তিরা সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি হামলা চালিয়েছে।
পাকিস্তানের দাবি, সীমান্ত এলাকায় তীব্র হতে থাকা এই হামলার পরিকল্পনা মূলত প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানের মাটি থেকে হচ্ছে। তবে কাবুলের বর্তমান তালেবান সরকার পাকিস্তানের এই দাবি বারবারই অস্বীকার করে এসেছে। এর জেরে সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানের ভেতরে বেশ কয়েকটি বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। এসব হামলায় পাকিস্তানের পক্ষ থেকে শুধুমাত্র সশস্ত্র সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। তবে তালেবান সরকার এবং জাতিসংঘের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই সব হামলায় বহু সাধারণ বেসামরিক আফগান নাগরিকও প্রাণ হারিয়েছেন।