মৃত্যুর চার মাসের বেশি সময় পর আগামী ৯ জুলাই ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ দাফন করা হবে। এই উপলক্ষে রাজধানী তেহরানে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে আধা সামরিক বাহিনী বাসিজকে মোতায়েন করা হচ্ছে। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই অনুষ্ঠানকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরছে।
সন্ত্রাসবাদবিষয়ক গবেষক ও জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রাম অন এক্সট্রিমিজমের গবেষক ড. ওমর মোহাম্মদের মতে, ইসলামি রীতি অনুযায়ী, সাধারণত মৃত্যুর পর দ্রুত দাফনের নির্দেশনা রয়েছে এবং রাসায়নিকভাবে মরদেহ সংরক্ষণ নিরুৎসাহিত করা হয়। তাই খামেনির মরদেহ সম্ভবত রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় নয়, বরং হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, শিয়া ইসলামি আইন বিশেষ পরিস্থিতিতে দাফনে বিলম্বের সুযোগ দেয় এবং সর্বোচ্চ নেতার ক্ষেত্রে এই ধরনের ধর্মীয় ছাড় পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের একটি লক্ষ্যভিত্তিক হামলায় তেহরানে নিজের কম্পাউন্ডে খামেনি নিহত হন। তিনি টানা ৩৬ বছর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন। ড. মোহাম্মদের দাবি, হামলাটি ছিল শক্তিশালী বাংকার-ভেদী অস্ত্র দিয়ে পরিচালিত। ফলে, মরদেহ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। তাঁর ভাষ্যমতে, মরদেহ সম্পূর্ণ অক্ষত থাকলে দাফন নিয়ে এত দীর্ঘ বিলম্ব বা স্থান পরিবর্তনের প্রয়োজন হতো না।
এদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষ খামেনির শেষ বিদায়কে শুধু একটি রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান নয়, বরং জাতীয় ঐক্য ও শক্তি প্রদর্শনের উপলক্ষ হিসেবেও তুলে ধরছে। ‘আমাদের প্রতিশোধ নিতেই হবে’—এই স্লোগানে আয়োজন করা হচ্ছে অনুষ্ঠানটি।
শহীদ ফাউন্ডেশনের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাবিষয়ক উপপ্রধান এবং দাফন অনুষ্ঠানের অন্যতম সমন্বয়কারী ইয়াকুব সোলেইমানি জানিয়েছেন, অনুষ্ঠানটি ‘পূর্ণ মর্যাদা ও জাঁকজমকের’ সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে। তিনি দাবি করেন, প্রায় ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতি এই অনুষ্ঠানকে ‘ঐতিহাসিক’ করে তুলবে। তবে স্থানীয় প্রশাসনের আরও বড় দাবি, ৬ জুলাই তেহরানের শোকযাত্রায় দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন। পরদিন শিয়া মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র নগরী কোমেও আরেকটি শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।
ড. মোহাম্মদের মতে, ইরানের পক্ষ থেকে দুই কোটি শোকাহত মানুষ, সারা দেশে ৩ কোটি ৫০ লাখ অংশগ্রহণকারী, ৯০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি ও ১৪ হাজার সাংবাদিকের উপস্থিতির যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তা মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা। তাঁর ভাষায়, সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ও শক্তির ভাবমূর্তি তুলে ধরতেই তেহরান সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
এদিকে ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, অনুষ্ঠান ঘিরে বাসিজ বাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নিরাপত্তা ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে নেতৃত্ব দেবে। মহাসড়কগুলোকে অস্থায়ী পার্কিংয়ে রূপান্তর, তেহরানের প্রতিটি জেলার সঙ্গে একটি করে প্রদেশের সমন্বয় এবং পাঁচ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক উপস্থিতির ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে। ইরাকি কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে যোগ দিলেও বিশ্বের কোনো বড় শক্তি তাদের শীর্ষ নেতাকে পাঠাচ্ছে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ভারত নিম্ন পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল পাঠাচ্ছে। জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখেইল কাভেলাশভিলি অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। ড. মোহাম্মদের মতে, এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত করে, আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পরিসরে ইরানের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা রয়েই গেছে।