অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) সদর দপ্তর গতকাল মঙ্গলবার ভেঙে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বে স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৭টায় ইসরায়েলি বাহিনী ওই কম্পাউন্ডে অভিযান চালায়। অভিযান শেষে মূল ভবনের ওপর ইসরায়েলের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময় বেন-গভির বলেন, ‘এটি জেরুজালেমে (ইসরায়েলি) সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার একটি ঐতিহাসিক দিন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজ এই সন্ত্রাসের সমর্থকদের, তারা যা কিছু তৈরি করেছে তার সবকিছুর সঙ্গে একসঙ্গে এখান থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি সন্ত্রাসের সমর্থকের সঙ্গে এভাবেই আচরণ করা হবে।’
অভিযানে বেন-গভিরের সঙ্গে ছিলেন জেরুজালেমের কট্টর ডানপন্থী ডেপুটি মেয়র আরিয়েহ কিং। ধ্বংসযজ্ঞের সময় আরিয়েহ কিং বলেন, ‘আমরা ইউএনআরডব্লিউএর সব কর্মীকে তাড়িয়ে দেব, হত্যা করব, নিশ্চিহ্ন করব এবং ধ্বংস করে দেব।’
ইউএনআরডব্লিউএর কমিশনার জেনারেল ফিলিপ লাজারিনি বলেন, এই ধ্বংস আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ‘খোলাখুলি ও ইচ্ছাকৃত অবজ্ঞার এক নতুন স্তর’ দেখিয়ে দিয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, ‘এটি একটি জাতিসংঘ সংস্থা ও এর স্থাপনার বিরুদ্ধে নজিরবিহীন হামলা।’ লাজারিনি আরও বলেন, ‘আজ ইউএনআরডব্লিউএর সঙ্গে যা ঘটছে, আগামীকাল সেটাই ঘটবে অন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে, হোক তা অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বা বিশ্বের অন্য যেকোনো স্থানে।’
সংস্থাটির আরবি ভাষার মুখপাত্র আদনান আবু হাসনা বলেন, ইসরায়েলের মতো করে কোনো দেশ আগে কখনো জাতিসংঘের পতাকা তাদের কার্যালয় থেকে নামিয়ে দেয়নি। তিনি আল-আরাবি টিভিকে বলেন, ‘ইসরায়েলের সিদ্ধান্তের ফলে এখন ইউএনআরডব্লিউএর আর কোনো সদর দপ্তর, অফিস বা প্রতিষ্ঠান মাটিতে অবশিষ্ট নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইসরায়েল ইউএনআরডব্লিউএ ভেঙে ফেলা এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থী সমস্যাকে নির্মূল করার অভিপ্রায় ঘোষণা করেছে।’
এদিকে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ধ্বংসযজ্ঞের পক্ষে সাফাই গেয়ে ইউএনআরডব্লিউএর সঙ্গে হামাসের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে। মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ‘ইউএনআরডব্লিউএ-হামাস ইতিমধ্যে এই স্থানে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করেছিল এবং সেখানে আর কোনো জাতিসংঘ কর্মী বা কার্যক্রম ছিল না।’ তাদের দাবি, ওই কম্পাউন্ড কোনো ধরনের কূটনৈতিক সুরক্ষা বা দায়মুক্তির আওতায় পড়ে না এবং এর দখল নেওয়া ইসরায়েলি ও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফিলিস্তিনি জেরুজালেম গভর্নরেট এই ধ্বংসযজ্ঞকে ‘বিপজ্জনক উসকানি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছে, এটি আন্তর্জাতিক দায়মুক্তিতে সুরক্ষিত একটি জাতিসংঘ সংস্থার ওপর সরাসরি হামলা।
এর আগে ২০২৪ সালে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট একটি আইন পাস করে, যার মাধ্যমে ইসরায়েল ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইউএনআরডব্লিউএ কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে ১৯৬৭ সালের একটি চুক্তি বাতিল করা হয়, যা ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ইউএনআরডব্লিউএকে কাজ করার অনুমতি দিয়েছিল। সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপ জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
জাতিসংঘ ও মানবিক সহায়তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ইউএনআরডব্লিউএর ওপর নির্ভরশীল লাখো ফিলিস্তিনি শরণার্থীর জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এ ছাড়া আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, এটি হয়তো ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের শরণার্থী মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার প্রথম ধাপ।
ইউএনআরডব্লিউএ গাজা, পশ্চিম তীর, জর্ডান, সিরিয়া ও লেবাননে প্রায় ৫৯ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে সেবা দিয়ে থাকে। অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজায় কার্যরত প্রধান জাতিসংঘ সংস্থা হলো ইউএনআরডব্লিউএ। গাজা উপত্যকায় অধিকাংশ ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম এই সংস্থার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। গাজায় প্রায় ২২ লাখ মানুষের বড় একটি অংশ খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার জন্য সংস্থাটির ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি ছোট ছোট ত্রাণ সংস্থাগুলোও তাদের কার্যক্রম চালাতে ইউএনআরডব্লিউএর বিতরণ নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে।